বন্ধুরা,আজ থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের নতুন রহস্য। এবার দিনের আলো নয়,গল্পের অভিযান হবে রাতের প্রকৃতিতে। তোমাদের কাছে নিশাচর প্রাণী নিয়ে কৌতূহল তৈরি হবে,কিন্তু কোনো ভয় নয়-থাকবে বিজ্ঞান, মমতা আর বিস্ময়।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
'প্রকৃতির গোয়েন্দারা'
পর্ব-৩৭:
সেদিন সন্ধ্যা থেকেই আকাশটা অদ্ভুত শান্ত।
পূর্ণিমার আলো ধীরে ধীরে গ্রামের পথ,মাঠ আর গাছের পাতায় রূপালি আভা ছড়িয়ে দিল।
রাহি উঠোনে বসে বই পড়ছিল। ঠিক তখনই বাইরে থেকে অরণ ডাক দিল,
-'রাহি, তাড়াতাড়ি এসো!'
শিসুও দৌড়ে এসেছে।
-'পুকুরপাড়ে সবাই ভিড় করেছে। কেউ একজন বলছে,রাতে নাকি অদ্ভুত একটা প্রাণী দেখা গেছে!'
তিনজন দ্রুত সেখানে পৌঁছাল।
কেউ বলছে, 'ভূত!'
কেউ বলছে, 'অশুভ কিছু!'
আবার কেউ বলছে, 'ওটাকে দেখলেই নাকি সর্বনাশ হয়!'
রাহি চুপচাপ সবার কথা শুনল।
তারপর বলল,
-'কেউ কি ভালো করে দেখেছে?'
সবাই একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল।
আসলে কেউই নিশ্চিত নয়।
ঠিক তখনই পাশের পুরোনো বটগাছের পাতা নরম হাওয়ায় দুলে উঠল।
বটদাদুর শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল,
-'অন্ধকারে মানুষ অনেক সময় কল্পনাকে সত্যি মনে করে। প্রকৃতির গোয়েন্দারা কখনো গুজবে বিশ্বাস করে না। তারা সত্য খুঁজে বের করে।'
অরণ টর্চ বের করল।
-'চলো, আমরা দেখে আসি। তবে খুব সাবধানে।'
তিন বন্ধু ধীরে ধীরে পুকুরপাড়ের পথ ধরে এগোল।
হঠাৎ...
একটি বড় ছায়া নীরবে উড়ে গিয়ে একটি শিমুলগাছের ডালে বসল।
শিসু একটু চমকে উঠল।
-'ওটা কী?'
রাহি টর্চের আলো সরাসরি প্রাণীটির দিকে না ফেলে গাছের নিচের দিকে ফেলল।
বটদাদু আগেই শিখিয়েছিলেন,বন্য প্রাণীর চোখে সরাসরি তীব্র আলো ফেলা উচিত নয়।
কিছুক্ষণ পর চাঁদের আলোয় তারা স্পষ্ট দেখতে পেল-
গোল মুখ।
বড় দুটি চোখ।
নরম পালক।
অরণ ধীরে বলল,
-'এ তো... একটি পেঁচা!'
ঠিক তখনই পেঁচাটি ডানা মেলে অন্য ডালে গিয়ে বসল।
তার নখে একটি বড় ইঁদুর।
শিসু বিস্ময়ে বলল,
-'ও তো আমাদের ধানের ক্ষতি করা ইঁদুর ধরছে!'
বটদাদুর কণ্ঠে মৃদু হাসি।
-'হ্যাঁ। অনেকেই পেঁচাকে অশুভ মনে করে। অথচ কৃষকের অন্যতম নীরব বন্ধু সে। একটি পেঁচা বছরে শত শত ইঁদুর ধরে ফসল রক্ষা করতে সাহায্য করে।'
ঠিক তখনই গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক আজিজ কাকা সেখানে এলেন।
তিনি বললেন,
-'আমার দাদাও বলতেন,পেঁচা থাকলে মাঠে ইঁদুর কমে। কিন্তু মানুষ কুসংস্কারের কারণে ওদের তাড়িয়ে দেয়।'
রাহি গভীরভাবে পেঁচাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো,অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা এই প্রাণীটি আসলে ভয়ের নয়,বরং প্রকৃতির এক পরিশ্রমী প্রহরী।
ঠিক তখনই পেঁচাটি আরেকবার ডাকল।
তারপর নিঃশব্দে রাতের আকাশে মিলিয়ে গেল।
অরণ নোটবই খুলে লিখল,
'নতুন রহস্যের প্রথম সূত্র-সব অচেনা প্রাণী ভয়ের নয়।'
শিসু বড় বড় অক্ষরে লিখল,
-'প্রথমে জানো,তারপর বিশ্বাস করো।'
বটদাদুর কণ্ঠ আবার ভেসে এল,
-'যে মানুষ জ্ঞানকে বন্ধু বানায়,তার কাছে অন্ধকারও আলোর পথ দেখায়।'
তিন বন্ধু বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল।
পূর্ণিমার আলোয় তাদের ছায়া লম্বা হয়ে গেছে।
আজ তারা শুধু একটি পেঁচা দেখেনি।
তারা শিখেছে,অজানাকে ভয় নয়,বুঝতে শেখাই প্রকৃতির গোয়েন্দার প্রথম পরিচয়।
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি কোনো বন্য প্রাণীকে কুসংস্কারের কারণে ক্ষতি করব না। আগে জানব,তারপর সিদ্ধান্ত নেব।
সবুজ তথ্যঃ
পেঁচা নিশাচর শিকারি পাখি। তারা ইঁদুরসহ অনেক ক্ষতিকর প্রাণী খেয়ে কৃষিজমির ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। তাই পেঁচা প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি পাখি।
চলবে...
বন্ধুরা,এখানে শুধু রহস্য নয়, সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণাকেও বিজ্ঞান ও মানবিকতার আলোয় ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এভাবেই 'রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী' শুধু গল্প নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা একটি সবুজ শিক্ষাযাত্রা গড়ে তুলতে চাই।