বন্ধুরা,আজকের পর্বে রহস্যের সমাধানের পথে আমরা আরও এক ধাপ এগোব।রাহি,অরণ আগের দুই পর্বের সূত্রগুলো আজ একসঙ্গে মিলতে শুরু করবে। গল্পে থাকবে অভিযান,আবেগ,প্রকৃতির বিজ্ঞান এবং আশার আলো।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
'প্রকৃতির গোয়েন্দারা'
পর্ব-৩৬
ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি।
রাহি,অরণ আর শিসু আজ খুব ভোরেই নদীর ঘাটে পৌঁছে গেল। গতকাল তারা ঠিক করেছিল,কোকিলের ক্ষীণ ডাক যেদিক থেকে ভেসে এসেছিল,আজ সেই দিকেই যাবে।
মাঝি কাকা নৌকা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন।
-'আজ বুঝি বড় রহস্যের খোঁজে?'
অরণ মুচকি হেসে বলল,
-'আজ হয়তো রহস্যের উত্তর মিলবে।'
নৌকাটি ধীরে ধীরে নদী পার হলো।
ওপারে নেমেই তারা অবাক।
এখানে এখনো অনেক পুরোনো গাছ দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল কাঁঠালগাছ, আমগাছ, জামগাছ আর শিমুলগাছ মিলে যেন সবুজ ছাতা তৈরি করেছে।
হঠাৎ...
-'কুহু... কুহু...'
একটি মিষ্টি সুর ভেসে এলো।
শিসু আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
-'এই তো!'
রাহি হাত তুলে ইশারা করল।
-'চুপ...'
কিছুক্ষণ পর তারা দেখল, দূরের এক উঁচু ডালে একটি কোকিল বসে ডাকছে।
তার কিছু দূরে আরেকটি কোকিল।
অরণ ফিসফিস করে বলল,
-'তাহলে ওরা হারিয়ে যায়নি!'
ঠিক তখনই বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এলো।
-'প্রকৃতি কাউকে ছেড়ে যায় না। নিরাপদ আশ্রয় না পেলে সে শুধু অন্য কোথাও চলে যায়।'
রাহি চারদিকে তাকিয়ে দেখল,এই বনটিতে মানুষের আনাগোনা কম।
বড় বড় গাছ আছে।
ঝোপঝাড়ও রয়ে গেছে।
পাখিদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ।
ঠিক তখনই বনরক্ষী কাকু সেখানে এলেন।
তিনি বললেন,
-'আমরা এই এলাকায় পুরোনো গাছ কাটতে দিই না। শুকিয়ে যাওয়া গাছও যতটা সম্ভব দাঁড়িয়ে রাখা হয়। কারণ অনেক পাখি সেগুলোতেই আশ্রয় খুঁজে পায়।'
অরণ তার খাতায় শেষ সূত্রটি লিখল-
'যেখানে বড় গাছ বেঁচে থাকে,সেখানে পাখিরাও ফিরে আসে।'
ফেরার পথে তিন বন্ধু নদীর পাড়ে কয়েকটি দেশীয় গাছের চারা রোপণ করল।
শিসু মাটি চাপা দিতে দিতে বলল,
-'আজ লাগানো এই ছোট্ট চারাগুলো বড় হলে হয়তো কোনো একদিন এখানেও কোকিল ডাকবে।'
রাহি হেসে বলল,
-'সেই দিনের জন্যই তো আজকের কাজ।'
বটদাদু মৃদু স্বরে বললেন,
-'একটি গাছ শুধু ছায়া দেয় না। সে অসংখ্য পাখির ঘর,অসংখ্য প্রাণের ভরসা,আর ভবিষ্যতের একটি প্রতিশ্রুতি।'
ফিরে এসে স্কুলে তারা বন্ধুদের সব কথা বলল।
শিক্ষক একটি বড় মানচিত্র টাঙিয়ে লিখলেন-
'আমাদের গ্রামের পাখির আবাস।'
শিশুরা ঠিক করল, প্রতি ঋতুতে তারা গ্রামের পাখিগুলোর খোঁজ রাখবে।
কোথায় নতুন বাসা হলো, কোথায় গাছ লাগানো দরকার, কোথায় পাখি কমে যাচ্ছে-সব তারা লিখে রাখবে।
সন্ধ্যায় রাহি বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল।
দূরে কোথাও থেকে আবার ভেসে এলো-
'কুহু... কুহু...'
সে মৃদু হেসে বলল,
-'কোকিল হারিয়ে যায়নি। আমরা তার জন্য পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম।'
বটদাদুর কণ্ঠে শেষবারের মতো শোনা গেল,
-'যে মানুষ প্রকৃতির ঘর রক্ষা করে,প্রকৃতি তার পৃথিবীকে গান দিয়ে ভরে দেয়।'
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি দেশীয় বড় গাছ রক্ষায় সচেতন থাকব এবং পাখির নিরাপদ আবাস তৈরিতে গাছ লাগানো ও গাছ সংরক্ষণে অংশ নেব।
সবুজ তথ্যঃ
কোকিল নিজে সাধারণত বাসা তৈরি করে না। সে অন্য কিছু পাখির বাসায় ডিম পাড়ে। তাই কোকিলের টিকে থাকা শুধু বড় গাছের ওপর নয়,অন্যান্য পাখির নিরাপদ অস্তিত্বের সঙ্গেও জড়িত। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণী একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বন্ধুরা,আজ একটি রহস্যের সমাপ্তি হলো। আগামী পর্ব-৩৭,আমরা নতুন অভিযানে যাব।
'রাতের অচেনা অতিথি'
এক রাতে রাহি ও অরণ গ্রামের বনে এমন এক নিশাচর প্রাণীর দেখা পাবে,যাকে সবাই ভুল বুঝে ভয় পায়। কিন্তু বটদাদু তাদের শেখাবেন-প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এতে শিশুদের মধ্যে অকারণ ভয় নয়,বিজ্ঞানভিত্তিক কৌতূহল তৈরি হবে।