বন্ধুরা, আজ 'প্রকৃতির গোয়েন্দারা' অধ্যায়ের প্রথম রহস্যের সমাপ্তি। তবে সমাপ্তি মানেই শেষ নয়-এটি শিশুদের শেখাবে, প্রকৃতিকে ভালোবাসলে পরিবর্তন সম্ভব।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
'প্রকৃতির গোয়েন্দারা'
পর্ব-৩৩:
সকালের আলো ফুটতেই রাহি, অরণ আর শিসু আবার সেই পুরোনো পুকুরের পাড়ে এসে দাঁড়াল।
আজ তারা একা নয়।
স্কুলের আরও কয়েকজন বন্ধু, তাদের শিক্ষক, গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ এবং জেলে কাকাও এসেছেন।
শিক্ষক বললেন,
-'আজ আমরা শুধু একটি পুকুর পরিষ্কার করতে আসিনি। আমরা শিখতে এসেছি, কীভাবে একটি জলাশয়কে ভালোবাসতে হয়।'
সবাই মিলে কাজ শুরু করল।
কেউ প্লাস্টিক ও বোতল আলাদা করল।
কেউ শুকনো ডালপালা সরাল।
বড়রা নিরাপদভাবে নালার মুখে জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কার করলেন,যাতে পুকুরে নোংরা পানি প্রবেশ না করে।
রাহি একটি বড় কাগজে লিখল,
'পুকুরে ময়লা ফেলবেন না।'
অরণ আর শিসু সেটি পুকুরপাড়ে টাঙিয়ে দিল।
ঠিক তখনই বাতাসে কদমফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে এলো।
বটদাদুর কণ্ঠ শোনা গেল,
-'প্রকৃতি কাউকে শাস্তি দিতে চায় না। সে শুধু একটু যত্ন চায়।'
কাজ শেষ হতে হতে দুপুর হয়ে গেল।
সবাই ক্লান্ত।
কিন্তু পুকুরটিকে যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত লাগছে।
জলের ওপর কয়েকটি ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে।
একটি সাদা বক ধীরে ধীরে পাড়ে নেমে এল।
শিসু আনন্দে বলল,
-'দেখো! অতিথিরা ফিরতে শুরু করেছে।'
শিক্ষক হেসে বললেন,
-'প্রকৃতি কখনো একদিনে বদলে যায় না। কিন্তু ভালো কাজের ফল একদিন না একদিন ফিরেই আসে।'
দিন কেটে গেল।
এক সপ্তাহ...
দুই সপ্তাহ...
তারপর এক সন্ধ্যায় আকাশে কালো মেঘ জমল।
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল।
রাহি জানালার পাশে বসে বই পড়ছিল।
হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এলো একটি পরিচিত শব্দ।
'ড্যাঁক... ড্যাঁক...'
সে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
অরণও ছুটে এসেছে।
শিসু তো আনন্দে লাফাচ্ছে।
'শুনতে পাচ্ছ? ব্যাঙ!'
পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে তারা দেখল, কয়েকটি ব্যাঙ জলের ধারে ডাকছে।
ফড়িংও উড়ছে।
জলে ছোট মাছের ঢেউ।
বটদাদুর কণ্ঠে আনন্দ ঝরে পড়ল,
-'প্রকৃতিকে যদি ভালোবাসো, সে একদিন গান গেয়ে তার উত্তর দেয়।'
রাহি মৃদু স্বরে বলল,
-'আমরা রহস্যের উত্তর পেয়ে গেছি।'
অরণ মাথা নাড়ল।
-'পুকুর কথা বলতে পারে না, কিন্তু তার প্রাণীরা কথা বলে।'
শিসু হেসে বলল,
-'আজ থেকে এই পুকুরের নাম আমি দিলাম,"হাসিমুখ পুকুর"।'
সবাই হেসে উঠল।
সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে আকাশে একটি রঙিন রামধনু দেখা দিল।
রাহির মনে হলো, প্রকৃতি যেন তাদের ছোট্ট দলটিকে আশীর্বাদ করছে।
বটদাদু শেষবারের মতো বললেন,
-'মনে রেখো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাদু কোনো জাদুর কাঠিতে নয়। মানুষের ভালোবাসা, দায়িত্ব আর ছোট ছোট কাজেই সেই জাদু লুকিয়ে থাকে।'
সেদিন থেকে গ্রামের শিশুরা মাসে একদিন 'সবুজ পাহারা' দেয়।
কেউ ময়লা ফেলে কি না, গাছের ক্ষতি হয় কি না, পুকুরের পানি পরিষ্কার আছে কি না-সব তারা খেয়াল রাখে।
কারণ তারা জানে, প্রকৃতির সত্যিকারের বন্ধু শুধু গাছ লাগায় না, গাছ, নদী, পুকুর আর প্রাণীদের প্রতিদিন ভালোও বাসে।
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি আমার এলাকার পুকুর,খাল ও জলাশয় পরিষ্কার রাখতে সচেষ্ট থাকব এবং প্রকৃতির যেকোনো সমস্যা দেখলে বড়দের জানাব।
সবুজ তথ্যঃ
একটি সুস্থ পুকুরে ব্যাঙ, ফড়িং, মাছ, শামুক, জলজ উদ্ভিদ এবং নানা অণুজীব একসঙ্গে বসবাস করে। এদের সবাই মিলে একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য তৈরি করে, যা পরিবেশকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বন্ধুরা,আগামীকাল আমারা নতুন রহস্যে যাব।পর্ব-৩৪-'হারিয়ে যাওয়া কোকিলের গান'। বসন্ত এলেও কেন কোকিলের ডাক শোনা যাচ্ছে না-সেই রহস্যের অনুসন্ধানে নামবে রাহি, অরণ, শিসু ও বটদাদু।