মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬

মস্কোতে পুতিন-শি বৈঠক: নতুন বিশ্বব্যবস্থার দৃষ্টান্ত গড়ার বার্তা, স্বাক্ষর ২০টির বেশি চুক্তিতে

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৫-০৫-০৯ ১২:১৯:৩৩
ছবি সংগৃহিত

বিশ্ব রাজনীতিতে যখন অনিশ্চয়তা আর বিভাজনের ছায়া ঘন, ঠিক তখনই রাশিয়া ও চীন মস্কোর বুকে বিশ্ব শাসনে যৌথ নেতৃত্বের প্রত্যয় ঘোষণা করল। বৃহস্পতিবার (৮ মে) রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ঐতিহাসিক বৈঠকে দুই পরাশক্তি ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন যুগে প্রবেশ’ করানোর অঙ্গীকার করেছে।

চার ঘণ্টার বৈঠকে ‘নতুন যুগের রূপরেখা’
মস্কোর ক্রেমলিন প্রাসাদে আয়োজিত এই দীর্ঘ বৈঠক ঘিরে ছিল রাজকীয় আয়োজন, কূটনৈতিক কৌশল এবং ভূরাজনৈতিক বার্তার বুনন। বৈঠক শেষে দুই নেতা এক যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন, যেখানে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনে চীন-রাশিয়ার যৌথ নেতৃত্বের কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়।
পুতিন জানান, "বিশ্বব্যাপী জটিল বাস্তবতায় রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক এখন স্থিতিশীলতার মানদণ্ড হয়ে উঠেছে। আমরা একসাথে একটি সুবিচার ও বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণে কাজ করছি।"

শি চিনপিংয়ের বার্তা: ‘একপাক্ষিকতা ও আধিপত্যবাদকে রুখতে হবে’
চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং বৈঠকে বলেন, “রাশিয়া ও চীন কেবল অর্থনীতিতে নয়, বৈশ্বিক নেতৃত্বেও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য-একটি স্থিতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক পরিবেশ গড়ে তোলা।”
তিনি আরও বলেন, “এই যুগ একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত ও দমননীতির নয়। রাশিয়া-চীন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেই আধিপত্যবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালন করবে।”

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের জবাবে ঘনিষ্ঠ রাশিয়া-চীন
বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক কেবল রুশ-চীন সম্পর্কের গভীরতাই নয়, বরং পশ্চিমা সামরিক ও অর্থনৈতিক জোটগুলোর বিরুদ্ধে এক বিকল্প জোটগঠনেরও বার্তা। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে শুরু হওয়া কট্টরপন্থী বৈদেশিক নীতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা শিবির থেকে রাশিয়ার বিচ্ছিন্নতা—এই দুই দেশকে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।

চুক্তির চমক: প্রযুক্তি, জ্বালানি, বিনিয়োগে বিপ্লব
বৈঠক শেষে উভয় দেশ ২০টিরও বেশি চুক্তি সই করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় যৌথ উন্নয়ন
জৈব নিরাপত্তা ও কোয়ারান্টাইন ব্যবস্থায় সমন্বয়
বিনিয়োগ নিরাপত্তা ও দুই দেশের আইনি কাঠামো সমন্বয়
চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি বিনিময়
রাশিয়ার জ্বালানি খাতে চীনা প্রযুক্তি হস্তান্তর

পুতিন জানান, “চীন এখন রাশিয়ার গাড়িশিল্প থেকে শুরু করে জ্বালানি খাত পর্যন্ত বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে রুশ-চীন বাণিজ্যে গুণগত পরিবর্তন আনা।”

পেছনের প্রেক্ষাপট: বিজয় দিবস, জোটবদ্ধ বার্তা
এই বৈঠকের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত মিত্রজোটের বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সামরিক কুচকাওয়াজে শি চিনপিংসহ বিশ্বের আরও কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত থাকবেন। কূটনৈতিক মহলে এই বৈঠককে নতুন এক ‘ভূরাজনৈতিক ঘূর্ণি’র সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষণ:
বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব পুনর্গঠনের লড়াইয়ে এখন মুখোমুখি দুই মেরু-একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সামরিক জোট, অপরদিকে চীন-রাশিয়ার নেতৃত্বে একটি বিকল্প বলয়। মস্কোর এই বৈঠক সেই পালাবদলেরই পরবর্তী ধাপ।


এ জাতীয় আরো খবর