মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬

দারিদ্র্য ও মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে গড়ে উঠছে স্বার্থের বাণিজ্য;প্রশ্নের মুখে মানবিকতার প্রকৃত চ

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৭-২৮ ১৫:৩৮:২৯

মহেশখালী (কক্সবাজার) 
মানুষ মানুষের জন্য এই চিরন্তন দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে মানবিকতার পথচলা। দুর্যোগে, দুর্ঘটনায়,রোগব্যাধিতে কিংবা  জীবনের  কঠিন  মুহূর্তে একে  অপরের  পাশে দাঁড়ানোই  সভ্য  সমাজের  সবচেয়ে  বড়  শক্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মানবিকতার এই মহান  মূল্যবোধকে পুঁজি  করে  ব্যক্তিগত  স্বার্থ, প্রচারণা, আর্থিক  সুবিধা এবং সামাজিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে। অনুসন্ধানে  দেখা  যায়, প্রকৃত মানবিক উদ্যোগের  পাশাপাশি  এমন কিছু  কর্মকাণ্ডও রয়েছে যেখানে অসহায়  মানুষের  দুঃখ-কষ্টকে  ব্যবহার করা হচ্ছে  প্রচারণার  হাতিয়ার  হিসেবে।  কোথাও  দানের নামে  আত্মপ্রচার, কোথাও  অনলাইনে  ভুয়া  তহবিল সংগ্রহ, কোথাও আবার মানবসেবার আড়ালে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার  অভিযোগ  উঠে আসছে। এসব ঘটনায় প্রকৃত মানবিক সংগঠনগুলোর ওপরও মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্যোগ  এলেই সক্রিয় হয় এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী বন্যা,ঘূর্ণিঝড়,অগ্নিকাণ্ড  কিংবা অন্যান্য দুর্যোগের সময়  হাজারো মানুষ যখন জীবন বাঁচানোর সংগ্রামে ব্যস্ত,তখন কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীসেই সংকটকে নিজেদের প্রচারণা ও সুবিধা আদায়ের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে। অনেক সময় ত্রাণ  বিতরণের চেয়ে ছবি তোলা ও সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে,প্রকৃত মানবিক সহায়তা এমনভাবে দেওয়া   উচিত    যাতে      উপকারভোগীর      মর্যাদা,
গোপনীয়তা ও সম্মান অক্ষুণ্ন থাকে।  অসহায় মানুষের কষ্টকে   প্রচারণার   উপাদান   বানানো   মানবিকতার মৌলিক  নীতির  পরিপন্থী।  সহানুভূতিকে  পুঁজি  করে প্রতারণা প্রযুক্তির প্রসারের  সঙ্গে অনলাইন প্রতারণার নতুন  কৌশলও  যুক্ত  হয়েছে।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  ভুয়া  অসুস্থতার   গল্প, জাল   চিকিৎসা  নথি, কৃত্রিম ত্রাণ তহবিল বা ভুয়া  স্বেচ্ছাসেবী পরিচয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসও দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রকৃত  সেবামূলক উদ্যোগও ক্ষতিগ্রস্ত
কিছু    অসাধু    ব্যক্তির    কর্মকাণ্ডের  কারণে  প্রকৃত স্বেচ্ছাসেবক,  দাতব্য    সংস্থা   ও   মানবিক   সংগঠন গুলোকেও   সন্দেহের   মুখে পড়তে হয়। অনেক দাতা অনুদান  দিতে  অনাগ্রহী  হয়ে  পড়েন।  ফলে সবচেয়ে বেশি    ক্ষতিগ্রস্ত   হন   সেইসব   মানুষ,  যারা  সত্যিই সহায়তার অপেক্ষায় থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের    মতামত,    সমাজবিজ্ঞানীদের  মতে, মানবিকতা   কখনো    প্রদর্শনের   বিষয়   নয়;  এটি দায়িত্ববোধ,সততা ও জবাবদিহিতার বিষয়। মানবিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা,অর্থের হিসাব প্রকাশ করা এবং উপকারভোগীর  মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি ব্যক্তি   ও    প্রতিষ্ঠানের   নৈতিক   দায়িত্ব।  মানবিক সহায়তার অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ নিশ্চিত  করতে হবে।   মানবিক  সহায়তা  কার্যক্রমে স্বচ্ছতা   ও   জবাবদিহিতা  বাড়াতে   হবে।  অসহায় মানুষের   ছবি   বা  ভিডিও ব্যবহারে কঠোর নৈতিক নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। প্রতারণা বা অনিয়মের অভিযোগ   উঠলে    নিরপেক্ষ   তদন্ত  করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।সাধারণ মানুষকে যাচাই-বাছাই করে অনুদান দেওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে হবে। মানবিকতা কোনো   ব্যবসা  নয়, কোনো  প্রচারণার  মাধ্যমও  নয়। এটি   মানুষের  প্রতি  দায়িত্ব, সহমর্মিতা  এবং  নৈতিক অঙ্গীকার।   যারা  মানবিকতার  মুখোশ  পরে মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও  দুর্দশাকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের  চেষ্টা করে, তারা  শুধু  আইন  নয়, সমাজের বিবেকের   কাছেও   দায়ী।  প্রকৃত  মানবিকতার  চর্চা নিশ্চিত   করতে   হলে   স্বচ্ছতা,   জবাবদিহিতা  এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে মানবসেবার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।   তাহলেই    মানবিকতার   মুখোশ   নয়,  প্রকৃত মানবতার জয় হবে।


এ জাতীয় আরো খবর