মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬

প্রতিশ্রুতি মিলেছে,মূল্য মেলেনি,মন্ত্রী-এমপির আশ্বাসের পরও বাড়েনি লবণের দাম,সংকটে হাজারো চাষী

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৭-২৮ ১৫:১৫:০২

মহেশখালী (কক্সবাজার)
মহেশখালী, কক্সবাজার  বাংলাদেশের লবণ শিল্পের অন্যতম  প্রধান   ভিত্তি   কক্সবাজারের মহেশখালী। প্রতিবছর  এখানকার  বিস্তীর্ণ  লবণ  মাঠে  হাজারো কৃষক সূর্যের তাপকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন করেন দেশের  খাদ্য  ও শিল্পখাতের জন্য প্রয়োজনীয় লবণ। কিন্তু   চলতি  মৌসুমে  উৎপাদন  অব্যাহত  থাকলেও ন্যায্যমূল্য  না  পাওয়ায় চরম হতাশা ও  অনিশ্চয়তায় পড়েছেন  প্রান্তিক  লবণচাষীরা।  চাষিদের অভিযোগ, মৌসুম শুরুর আগে লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।  স্থানীয়  জনপ্রতিনিধি  ও  সংশ্লিষ্টদের  পক্ষ থেকেও বাজার স্থিতিশীল রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু মৌসুম শেষ হলেও  সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন বাজারে  দেখা যায়নি।  ফলে  উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও লবণের  দাম বাড়েনি।  উৎপাদন   ব্যয়   বাড়ছে, আয় কমছে একসময় যে লবণচাষ ছিল উপকূলের মানুষের লাভজনক   জীবিকা,  বর্তমানে   তা   অনেকের  জন্য লোকসানের   খাতে   পরিণত   হচ্ছে।  জমির  ইজারা, পলিথিন,  সেচ,  ডিজেল,  শ্রমিকের  মজুরি, পরিবহন, খাদ্যপণ্যসহ   প্রায়  সব  খাতেই  ব্যয়  বেড়েছে। অথচ উৎপাদিত লবণ বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে।
চাষিদের ভাষ্য, অনেকেই  দাদনের  টাকা  পরিশোধ করতে বাধ্য হয়ে মৌসুমের শুরুতেই কম দামে লবণ বিক্রি করে দেন। এতে প্রকৃত লাভের বড় অংশ চলে যায়    মধ্যস্বত্বভোগীদের   হাতে।  মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে  ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদক স্থানীয় লবণচাষীদের অভিযোগ, মাঠ  থেকে কম  দামে লবণ সংগ্রহ করে গুদামজাত  ও  মজুতের  মাধ্যমে পরে অধিক দামে বিক্রি  করা  হয়।  উৎপাদক  ও  ভোক্তার মাঝখানে একাধিক স্তরের ব্যবসায়ীর কারণে প্রকৃত চাষী ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাব  এবং  সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা সীমিত থাকায় এ পরিস্থিতি বছরের পর বছর চলমান।
মহেশখালীর অর্থনীতি ঝুঁকিতে, মহেশখালীর হাজারো পরিবার  সরাসরি  লবণচাষের   সঙ্গে জড়িত। এছাড়া পরিবহন, শ্রম,গুদামজাতকরণ, বিপণনসহ আরও বহু মানুষের  জীবিকা  এই  শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাই লবণের  বাজারে  অস্থিরতা  শুধু কৃষকদের নয়, পুরো স্থানীয়  অর্থনীতির  ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চাষিদের   মতে, এভাবে  ন্যায্যমূল্য  না পেলে আগামী মৌসুমে   অনেকে   লবণচাষ  থেকে  সরে যেতে বাধ্য হবেন।  এতে  দেশীয়  উৎপাদন  কমে গিয়ে ভবিষ্যতে আমদানিনির্ভরতা  বাড়ার  ঝুঁকিও  তৈরি  হতে পারে।
সরকারি  হস্তক্ষেপের দাবি,   লবণচাষীরা   অবিলম্বে কয়েকটি    পদক্ষেপ   নেওয়ার   দাবি   জানিয়েছেন উৎপাদন  ব্যয়ের সঙ্গে  সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা। সরকারি পর্যায়ে সরাসরি লবণ ক্রয়ের ব্যবস্থা।বাজারে সিন্ডিকেট,মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান। প্রান্তিক চাষিদের জন্য সহজ শর্তে  ঋণ  ও  উৎপাদন  উপকরণে  ভর্তুকি।  আধুনিক সংরক্ষণাগার  নির্মাণ  এবং  বিপণন  ব্যবস্থার  উন্নয়ন।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত,অর্থনীতি ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের  লবণ  শিল্পকে  টেকসই রাখতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়; উৎপাদক যেন ন্যায্যমূল্য পান, সেই  নিশ্চয়তাও  দিতে হবে। অন্যথায় লবণচাষে মানুষের  আগ্রহ   কমে যাবে,   যা  দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির  জন্যও  ক্ষতিকর  হবে। মহেশখালীর লবণ মাঠে প্রতিদিন হাজারো কৃষক কঠোর পরিশ্রমে দেশের জন্য  সম্পদ  উৎপাদন  করছেন।  কিন্তু সেই সম্পদের ন্যায্য  মূল্য   যদি  উৎপাদক  না  পান, তবে প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমেই  সীমাবদ্ধ  থাকবে।  তাই এখন সময় আশ্বাস নয়, বাস্তব পদক্ষেপের। প্রান্তিক লবণচাষীদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে শুধু তাদের জীবনমানই উন্নত হবে না, দেশের ঐতিহ্যবাহী লবণ শিল্পও আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।

 


এ জাতীয় আরো খবর