মহেশখালী (কক্সবাজার)
সমাজে পুলিশ সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা দূর করা, আইন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলা এবং একটি অপরাধমুক্ত, মানবিক ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে কক্সবাজার জেলা পুলিশ। সেই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (২৮ জুলাই ২০২৬) কক্সবাজারের বদরখালী কলোনীজেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় একটি সচেতনতামূলক ও মতবিনিময় সভা, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার। অনুষ্ঠানে পুলিশ সুপার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা। তিনি বলেন, পুলিশ জনগণের বন্ধু। অপরাধ দমন করার পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবিক সহায়তা প্রদানও পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব। নারী নির্যাতন,ইভটিজিং ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতার আহ্বান সভায় নারী নির্যাতন, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং, সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং অন্যান্য সামাজিক অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, একটি ছোট ভুল সিদ্ধান্ত একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে পারে।তাই যেকোনো ধরনের অপরাধ, সহিংসতা বা হয়রানির শিকার হলে তা গোপন না রেখে পরিবার, শিক্ষক কিংবা নিকটস্থ থানায় জানাতে হবে। তিনি বিশেষভাবে মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষার্থীদের সরব অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব। শিক্ষার্থীরা পুলিশের দায়িত্ব, আইনগত সহায়তা, সাইবার নিরাপত্তা, সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। পুলিশ সুপার ধৈর্যসহকারে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেন এবং বাস্তব উদাহরণ দিয়ে আইন সম্পর্কে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, পুলিশ সম্পর্কে কোনো ভুল ধারণা থাকলে তা দূর করতে সরাসরি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। জনগণের সহযোগিতা ছাড়া অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কখনোই সম্ভব নয়।
শিক্ষার মানোন্নয়ন ও জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে দিকনির্দেশনা আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক আলোচনা ছাড়াও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মানোন্নয়ন, নৈতিক মূল্যবোধ, সময় ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন পুলিশ সুপার।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, জীবনে বড় হতে হলে প্রথমে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম,সততা, শৃঙ্খলা এবং অধ্যবসায়।পরীক্ষায় ভালো ফল করার পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। অনুপ্রেরণার গল্পে উজ্জীবিত শিক্ষার্থীরা বক্তব্যের একপর্যায়ে পুলিশ সুপার নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং দেশের বিভিন্ন সফল ব্যক্তির সংগ্রাম, ত্যাগ ও সাফল্যের গল্প তুলে ধরেন। তিনি বলেন,প্রতিকূলতা কখনোই সাফল্যের পথে বাধা নয়; বরং তা মানুষকে আরও শক্তিশালী করে। সীমিত সুযোগ নিয়েও অসংখ্য মানুষ দেশ-বিদেশে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন শিক্ষার্থীদেরও সেই মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের মতামত শুনলেন পুলিশ সুপার অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষা ব্যবস্থা, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত শোনেন পুলিশ সুপার। তিনি তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও পরামর্শ ভবিষ্যতের সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইতিবাচক পুলিশ-জনসম্পর্ক গঠনের প্রয়াস সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিদ্যালয়ভিত্তিক এ ধরনের সচেতনতা মূলক কর্মসূচি শুধু শিক্ষার্থীদের আইন সম্পর্কে সচেতনই করবে না, বরং পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব কমিয়ে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করবে। বিশেষ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুলিশের মানবিক ভূমিকা তুলে ধরতে এ ধরনের উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। শেষে শিক্ষার্থীরা এ ধরনের সচেতনতামূলক আয়োজন নিয়মিত করার দাবি জানান এবং পুলিশ সুপারের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা জানান।