বন্ধুরা,গত পর্বে আমরা জেনেছিলাম শিকড়ের অদৃশ্য বন্ধুদের কথা। আজ সেই মাটির গোপন শহর থেকেই আমরা খুঁজে পাব এক আশ্চর্য রহস্য-একটি ছোট্ট বীজের ভেতরে কীভাবে লুকিয়ে থাকে একটি সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ গাছের সম্ভাবনা।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'মাটির নিচের গোপন শহর'
পর্ব-৫৭:
সকালের রোদ তখন উঠোনের এক কোণে এসে পড়েছে।
রাহি কদমচারাটির পাশে পানি দিচ্ছিল।
অরণ হাতে একটি পুরোনো কাঠের বাক্স নিয়ে দৌড়ে এল।
-'রাহি! শিসু! দেখো আমি কী পেয়েছি!'
শিসু দৌড়ে এসে বাক্সের ভেতর তাকাল।
ভেতরে কয়েকটি শুকনো বীজ।
কেউ গোল,কেউ লম্বাটে,কেউ আবার একেবারে ছোট।
শিসু ভ্রু কুঁচকে বলল,
-'এগুলো তো দেখতে পাথরের মতো!'
রাহি একটি বীজ হাতে নিয়ে বলল,
-'কিন্তু এর ভেতরে কী আছে?'
অরণ বলল,
-'চলো,নাসির স্যারকে জিজ্ঞেস করি।'
তিন বন্ধু স্যারের কাছে গেল।
স্যার একটি বীজ হাতে নিয়ে বললেন,
-'এই ছোট্ট বীজটিকে খুব সাধারণ মনে হচ্ছে,তাই না?'
তিনজনই মাথা নাড়ল।
-'কিন্তু এর ভেতরে একটি নতুন গাছের শুরু লুকিয়ে থাকতে পারে।'
শিসুর চোখ গোল হয়ে গেল।
-'এতটুকুর ভেতরে একটা গাছ?'
স্যার হেসে বললেন,
-'পুরো বড় গাছ নয়। তবে নতুন গাছের ভ্রূণ,খাদ্য সঞ্চয় এবং বীজের আবরণসহ এমন কিছু অংশ থাকে, যা সঠিক পরিবেশ পেলে নতুন গাছের জন্মের শুরু করতে পারে।'
রাহি বিস্ময়ে বীজটির দিকে তাকিয়ে রইল।
-'তাহলে একটা বীজ আসলে ভবিষ্যৎকে ধরে রাখে!'
বটদাদুর পাতাগুলো হাওয়ায় দুলে উঠল।
-'ঠিক বলেছ।'
অরণ নোটবই খুলে লিখল,
'নতুন সূত্র-ছোট বীজের মধ্যে লুকিয়ে থাকে বড় সম্ভাবনা।'
নাসির স্যার বললেন,
-'তবে শুধু মাটিতে ফেলে দিলেই সব বীজ গাছ হয় না। বীজের ধরন অনুযায়ী পানি,তাপমাত্রা,বাতাস,আলো এবং উপযুক্ত পরিবেশের প্রয়োজন হতে পারে।'
শিসু বলল,
-'তাহলে বীজেরও নিজের সময় আছে?'
-'অবশ্যই।'
রাহি হঠাৎ তার হাতে থাকা একটি বীজের দিকে তাকিয়ে বলল,
-'এটা যদি আজ মাটিতে দিই,কালই কি গাছ হয়ে যাবে?'
সবাই হেসে ফেলল।
স্যার বললেন,
-'প্রকৃতির কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজই এত তাড়াহুড়ো করে হয় না।'
এই কথাটি রাহির মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
তারা একটি উপযুক্ত জায়গা বেছে নিল।
মাটি আলতো করে সরিয়ে একটি বীজ সেখানে রাখা হলো।
শিসু খুব যত্ন করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিল।
তারপর এক মগ পানি ঢালতে গিয়ে থেমে গেল।
-'বেশি পানি দিলে কি তাড়াতাড়ি বড় হবে?'
স্যার বললেন,
-'না। অতিরিক্ত পানিও অনেক বীজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যত্ন মানে শুধু বেশি কিছু দেওয়া নয়; যতটুকু দরকার,ততটুকু দেওয়া।'
রাহি মুগ্ধ হয়ে বলল,
-'এই কথাটা শুধু গাছের জন্য নয়,মানুষের ক্ষেত্রেও সত্যি।'
অরণ হাসল।
-'রাহি আজ আবার বটদাদুর মতো কথা বলছে!'
সবাই হেসে উঠল।
দিন কেটে গেল।
প্রথম দিন কিছুই হলো না।
দ্বিতীয় দিনও না।
তৃতীয় দিনেও মাটির ওপর কোনো পরিবর্তন নেই।
শিসু একটু হতাশ হয়ে বলল,
-'মনে হয় বীজটা ঘুমিয়েই আছে।'
বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এল,
-'কিছু অপেক্ষা বাইরে থেকে নীরব মনে হয়। ভেতরে তখনই হয়তো সবচেয়ে বড় কাজটি চলছে।'
রাহি মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
-'তাহলে আমরা অপেক্ষা করব।'
চতুর্থ সকালে তারা দৌড়ে এসে দেখল-
মাটির বুক একটু ফুঁড়ে একটি ক্ষুদ্র সবুজ বাঁক বেরিয়ে এসেছে।
শিসু আনন্দে চিৎকার করে উঠল,
-'ওঠেছে! উঠেছে!'
অরণ হাঁটু গেড়ে বসে গেল।
রাহির চোখে আনন্দের ঝিলিক।
একটি ছোট্ট সবুজ অঙ্কুর।
কত ছোট!
কিন্তু তার ভেতরে ভবিষ্যতের কত বড় সম্ভাবনা!
রাহি খুব আস্তে বলল,
-'তুমি একদিন বড় হবে। হয়তো তোমার ডালে পাখি বসবে। হয়তো তোমার ছায়ায় কোনো শিশু খেলবে।'
শিসু অঙ্কুরটির পাশে একটি ছোট কাঠি পুঁতে দিল।
-'যাতে কেউ ভুল করে পা না দেয়।'
অরণ বলল,
-'আমরা এর নাম রাখব?'
রাহি কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
-'স্বপ্ন।'
বটদাদুর পাতাগুলো আবার দুলে উঠল।
-'খুব সুন্দর নাম। কারণ প্রতিটি গাছ একদিন একটি স্বপ্ন ছিল।'
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার আগে রাহি ডায়েরিতে লিখল,
'আজ আমি একটি গাছ জন্মাতে দেখলাম। আসলে গাছটি আজ জন্মায়নি। তার গল্প শুরু হয়েছিল অনেক আগেই, যখন সে ছিল একটি ছোট্ট বীজ।'
তারপর সে আরও একটি লাইন লিখল-
'একটি বীজকে যত্ন করা মানে শুধু একটি গাছকে নয়,একটি ভবিষ্যৎকে বাঁচিয়ে রাখা।'
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি বীজ, চারা ও ছোট গাছকে অবহেলা করব না। একটি ছোট অঙ্কুরের মধ্যেও ভবিষ্যতের একটি বড় গাছ লুকিয়ে আছে-এই কথা মনে রাখব।
সবুজ তথ্যঃ
বীজের ভেতরে নতুন উদ্ভিদের ভ্রূণ থাকে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে বীজ পানি গ্রহণ করে এবং অঙ্কুরোদ্গমের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর শিকড় ও কাণ্ডের বৃদ্ধি ধীরে ধীরে নতুন চারাকে গড়ে তোলে।
বন্ধুরা, আগামী পর্ব-৫৮-এর শিরোনাম: 'বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা'
রাহি, অরণ ও শিসু দেখবে সেই ছোট্ট বীজের অঙ্কুরোদ্গমের পর তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজনগুলোর একটি-পানি। কিন্তু হঠাৎ এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হবে,যেখানে অতিরিক্ত বৃষ্টি যেমন বিপদ ডেকে আনতে পারে,তেমনি বৃষ্টির অভাবও চারাটিকে বিপন্ন করতে পারে।
সেখান থেকে গল্পে আসবে 'পানি, মাটির ভারসাম্য, জলধারণ ক্ষমতা ও গাছের বেঁচে থাকার বিজ্ঞান'-তবে সবকিছু থাকবে গল্পের ভেতর,কোনো শুকনো পাঠ্যবইয়ের মতো নয়।