শনিবার, আগস্ট ১৫, ২০২৬

'শিকড়ের গোপন বন্ধু'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-১৪ ১৬:১৪:১৯
প্রতীকী ছবি

বন্ধুরা,গত পর্বে আমরা জেনেছিলাম,মাটির নিচে এমন এক অদৃশ্য জগৎ আছে,যাদের দেখা যায় না অথচ পৃথিবীর জীবনের জন্য তারা অপরিহার্য। আজ সেই রহস্য আরও গভীর হবে-গাছের শিকড় আর মাটির ক্ষুদ্র জীবদের মধ্যে যে নীরব বন্ধুত্ব,তার গল্প।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'মাটির নিচের গোপন শহর'
পর্ব–৫৬: 

সকালটা ছিল শান্ত।
কদমচারাটির পাতায় তখনও রাতের শিশিরের ফোঁটা।
রাহি চারাটির পাশে বসে মাটি দেখছিল।
হঠাৎ সে বলল,
-'আমরা গাছের পাতা দেখি, ফুল দেখি, ফল দেখি। কিন্তু গাছের নিচে কী আছে, সেটা তো দেখতে পাই না।'

অরণ বলল,
-'শিকড়।'

শিসু সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
-'আর শিকড়ের নিচে নিশ্চয়ই আরও একটা রহস্য আছে!'

ঠিক তখনই নাসির স্যার এসে দাঁড়ালেন।
তিনি বললেন,
-'আজ তোমরা সেই রহস্যের একটু কাছে যাবে। তবে মাটি খুঁড়ে গাছের শিকড় নষ্ট করা যাবে না। আমরা শুধু জানব।'

তিন বন্ধু মন দিয়ে শুনতে লাগল।
স্যার বললেন,
-'গাছের শিকড় মাটি থেকে পানি ও বিভিন্ন পুষ্টি গ্রহণ করে। কিন্তু শিকড়ের চারপাশে থাকা মাটিতে এমন কিছু ক্ষুদ্র জীবও থাকে,যারা গাছের সঙ্গে নানা ধরনের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।'

রাহি জিজ্ঞেস করল,
-'তারা কি গাছের বন্ধু?'

-'অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাঁ।'

অরণ অবাক হয়ে বলল,
-'কিন্তু বন্ধুত্ব যদি চোখেই দেখা না যায়?'

বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এল,
-'সব বন্ধুত্ব হাত মেলায় না। কিছু বন্ধুত্ব মাটির নিচে তৈরি হয়।'

শিসু মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-'কীভাবে?'

নাসির স্যার বললেন,
-'কিছু ছত্রাকের সূক্ষ্ম জাল শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। এই সম্পর্ককে অনেক সময় মাইকোরাইজা বলা হয়। এতে ছত্রাক ও গাছ উভয়েই উপকৃত হতে পারে।'

রাহির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
-'মানে,গাছের শিকড়ের সঙ্গে ছত্রাকেরও বন্ধুত্ব হতে পারে?'

-'হ্যাঁ।'

অরণ নোটবই খুলে লিখল,
-'নতুন সূত্র-মাটির নিচে শিকড়েরও বন্ধু আছে।'

শিসু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
-'তাহলে গাছ একা দাঁড়িয়ে থাকলেও আসলে একা নয়!'

বটদাদু যেন একটু হেসে উঠলেন।
-'এই কথাটাই আজ মনে রেখো।'

রাহি চারাটির দিকে তাকাল।
উপরে তার ছোট্ট সবুজ পাতা।
নিচে মাটির অন্ধকার।
আর সেই অন্ধকারের মধ্যে শিকড় ছড়িয়ে আছে।
শিকড়ের চারপাশে অসংখ্য ক্ষুদ্র জীবের ব্যস্ততা।
একটি ছোট চারাকে ঘিরে যেন বিশাল এক অদৃশ্য সমাজ।

অরণ বলল,
-'আমরা শুধু গাছটাকে দেখি। কিন্তু গাছটার জীবন আসলে অনেক বড় একটা দলের ওপর নির্ভর করে!'

নাসির স্যার মাথা নাড়লেন।
-'প্রকৃতি একা একা কাজ করে না। এক জীব অন্য জীবের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। এই সম্পর্কগুলোই পরিবেশকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।'

হঠাৎ শিসু চারাটির পাশে পড়ে থাকা একটি প্লাস্টিকের টুকরো দেখতে পেল।
সে সেটি তুলে নিয়ে বলল,
-'এটা এখানে থাকলে কি মাটির ক্ষতি হবে?'

স্যার বললেন,
-'প্লাস্টিক মাটিতে সহজে প্রাকৃতিকভাবে মিশে যায় না। তাই যেখানে সম্ভব,প্লাস্টিকের আবর্জনা মাটিতে ফেলা বন্ধ করা এবং সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা খুব জরুরি।'

শিসু সঙ্গে সঙ্গে টুকরাটি নিজের ব্যাগে রেখে দিল।
-'আজ থেকে আমি গাছের গোড়ায় কোনো আবর্জনা থাকতে দেব না।'

রাহি হাসল।
-'শুধু গাছের গোড়ায় নয়,যেখানে দেখবে সেখানেই মানুষকে সচেতন করবে।'

বিকেলের দিকে তারা যখন বাড়ি ফিরছিল, তখন রাহি বারবার চারাটির দিকে ফিরে তাকাচ্ছিল।
তার মনে হচ্ছিল,এতদিন সে গাছকে শুধু একটি গাছ হিসেবেই দেখেছে।
আজ প্রথমবার সে বুঝল-একটি গাছের জীবন মাটির ওপরে যতটা,মাটির নিচেও ততটাই বিস্ময়কর।
বাড়ি ফেরার আগে সে ডায়েরিতে লিখল,
'আজ বুঝলাম,শিকড় মাটির ভেতর শুধু পানি খোঁজে না। সেখানে গাছের অদৃশ্য বন্ধুরাও থাকে।'

বটদাদুর শেষ কথাটি সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে এল,
-'যে শিশু প্রকৃতির বন্ধুত্ব বুঝতে শেখে,সে কখনো কোনো প্রাণীকে আলাদা করে দেখে না। সে পুরো পৃথিবীকে একটি পরিবারের মতো দেখতে শেখে।'

আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি গাছের শিকড়, মাটি ও মাটির ক্ষুদ্র জীবের আবাস অকারণে নষ্ট করব না। গাছের গোড়ায় প্লাস্টিক বা অন্য আবর্জনা ফেলব না।

সবুজ তথ্যঃ
মাইকোরাইজা হলো উদ্ভিদের শিকড় ও নির্দিষ্ট ছত্রাকের পারস্পরিক সম্পর্ক। অনেক ক্ষেত্রে ছত্রাকের সূক্ষ্ম জাল মাটি থেকে পানি ও কিছু পুষ্টি সংগ্রহে গাছকে সহায়তা করতে পারে, আর গাছ ছত্রাককে নিজের তৈরি খাদ্যের একটি অংশ দেয়।

বন্ধুরা,আজকের পর্বের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
আগামীপর্ব-'বীজের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা বন'।
রাহি,অরণ ও শিসু এবার একটি অদ্ভুত বীজ খুঁজে পাবে। বাইরে থেকে একেবারে সাধারণ-কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি ভবিষ্যৎ গাছের নকশা। সেখান থেকে আমরা গল্পের মাধ্যমে তোমাদের নিয়ে যাব 'বীজ,অঙ্কুরোদ্গম ও নতুন জীবনের রহস্যে'।


এ জাতীয় আরো খবর