বন্ধুরা,গতকাল পিঁপড়েদের রাজপথ পেরিয়ে আমরা পৌঁছেছিলাম মাটির আরও গভীরে। আজ পরিচয় হবে এমন এক নীরব শ্রমিকের সঙ্গে,যে কোনো প্রশংসা ছাড়াই মাটিকে জীবন্ত রাখে।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'মাটির নিচের গোপন শহর'
পর্ব-৫৩:
বৃষ্টির পরের সকাল।
মাটির গন্ধে ভরে আছে চারপাশ।
রাহি উঠোনের কদমচারাটির পাশে বসে মাটি দেখছিল।
অরণ হাতে একটি ছোট কাঠি নিয়ে শুকনো পাতাগুলো সরাতেই শিসু চিৎকার করে উঠল,
-'ওই দেখো!'
মাটির ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো একটি কেঁচো।
তার শরীর মাটিতে মাখামাখি।
শিসু একটু পিছিয়ে গেল।
-'এটা তো দেখতে বেশ অদ্ভুত!'
রাহি হেসে বলল,
-'অদ্ভুত হলেই কি খারাপ?'
ঠিক তখনই বটপাতা নড়ে উঠল।
বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এল,
-'প্রকৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ এমন প্রাণীরাই করে,যাদের আমরা খুব কমই লক্ষ্য করি।'
নাসির স্যারও সেখানে এসে পৌঁছালেন।
তিনি মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
-'তোমরা কি জানো,এই ছোট্ট প্রাণীটি মাটির জন্য কত বড় কাজ করে?'
অরণ আগ্রহ নিয়ে বলল,
-'কী কাজ?'
স্যার বললেন,
-'কেঁচো মাটির ভেতর দিয়ে চলার সময় ছোট ছোট সুড়ঙ্গ তৈরি করে। এতে মাটির ভেতরে বাতাস ও পানি চলাচলের সুযোগ বাড়ে।'
রাহি মুগ্ধ হয়ে বলল,
-'মানে,কেঁচো মাটির নিচে রাস্তা বানায়?'
-'ঠিক তাই। আর শুধু রাস্তা নয়।'
স্যার পাশে পড়ে থাকা শুকনো পাতার দিকে ইশারা করলেন।
-'গাছের পাতা ও অন্যান্য জৈব পদার্থ ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশতে সাহায্য করে কেঁচো। এর ফলে মাটিতে উদ্ভিদের জন্য দরকারি পুষ্টি ফিরে আসে।'
শিসু এবার কেঁচোটার দিকে নতুন চোখে তাকাল।
-'তাহলে ও আসলে মাটির কৃষক!'
বটদাদু হেসে বললেন,
-'তাই তো তোমরা তাকে আজ থেকে 'নীরব কৃষক' বলতে পারো।'
অরণ খাতায় বড় করে লিখল,
'নীরব কৃষক-কেঁচো।'
ঠিক তখনই শিসু কেঁচোটিকে আঙুল দিয়ে ধরতে যাচ্ছিল।
রাহি তার হাত থামিয়ে দিল।
-'না,ওকে ধরো না। ওকে নিজের কাজ করতে দাও।'
শিসু হাত সরিয়ে নিল।
-'ঠিক আছে। আমরা শুধু দেখব।'
তিন বন্ধু চুপচাপ বসে রইল।
কেঁচোটি ধীরে ধীরে মাটির ভেতরে ঢুকে গেল।
কিছুক্ষণ পর আর তাকে দেখা গেল না।
শিসু মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-'এত ছোট একটা প্রাণী,অথচ তার কাজ এত বড়!'
বটদাদুর কণ্ঠে কোমলতা ছিল।
-'পৃথিবী শুধু বড় প্রাণীদের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। অদৃশ্য ও ক্ষুদ্র শ্রমিকদের ওপরও পৃথিবীর জীবন অনেকখানি নির্ভর করে।'
রাহি চারাটির দিকে তাকাল।
-'তাহলে এই গাছটাও কি তার কাছে ঋণী?'
নাসির স্যার বললেন,
-'অবশ্যই। সুস্থ মাটি মানেই সুস্থ গাছের সম্ভাবনা বেশি। আর সুস্থ গাছ মানেই আরও ভালো পরিবেশ।'
অরণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
-'আমরা তো এতদিন গাছ দেখেছি, ফুল দেখেছি, পাখি দেখেছি। কিন্তু গাছের নিচের মাটির ভেতরেও যে এত কাজ চলছে, তা কখনো ভাবিনি।'
রাহি হেসে বলল,
-'আমাদের সবুজ পৃথিবী শুধু ওপরে নয়, নিচেও বেঁচে আছে।'
বিকেলে বাড়ি ফেরার আগে তিন বন্ধু সেই জায়গায় আর পা দিল না।
তারা শুকনো পাতা সরিয়ে মাটি পরিষ্কার না করে বরং সেগুলো সেখানেই রেখে দিল।
কারণ আজ তারা জেনে গেছে-
সব শুকনো পাতা আবর্জনা নয়।
কখনো কখনো সেগুলোই মাটির ভবিষ্যৎ খাবার।
রাহি ডায়েরিতে লিখল,
-'আজ আমি মাটির নিচে একজন নীরব কৃষককে দেখলাম। সে কথা বলে না,কিন্তু পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার কাজে প্রতিদিন ব্যস্ত থাকে।'
বটদাদুর কণ্ঠ বাতাসে ভেসে এল,
-'যে মানুষ মাটির ছোট প্রাণীদের সম্মান করতে শেখে,সে কখনো মাটিকে কেবল ধুলো মনে করে না।'
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি অকারণে মাটি খুঁড়ব না,কেঁচো বা অন্যান্য মাটির প্রাণীকে ক্ষতি করব না এবং জৈব আবর্জনা মাটির স্বাভাবিক চক্রে ফিরতে দেওয়ার গুরুত্ব বুঝব।
সবুজ তথ্যঃ
কেঁচোর চলাচলে মাটিতে ছোট ছোট ছিদ্র ও পথ তৈরি হয়, যা মাটির ভেতরে বায়ু ও পানির চলাচলে সহায়তা করতে পারে। কেঁচোর দেহ দিয়ে মাটি ও জৈব পদার্থ অতিক্রম করার ফলে পুষ্টিসমৃদ্ধ কেঁচোসারও তৈরি হয়, যা মাটির উর্বরতার জন্য উপকারী।
বন্ধুরা, আগামী পর্বে আমরা মাটির আরও গভীরে যাব। রাহি, অরণ ও শিসু আবিষ্কার করবে-গাছ থেকে ঝরে পড়া একটি শুকনো পাতা আসলে শেষ হয়ে যায় না; মাটির অণুজীব,ছত্রাক ও ক্ষুদ্র প্রাণীদের হাতে সেটি ধীরে ধীরে নতুন জীবনের খাদ্যে পরিণত হয়।