মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে জাপানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সূচনা করলেন দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়াওয়াটা (Yawata) শহরের মেয়র শোওকো কাওয়াতা (Shoko Kawata)। দেশটির কোনো আসীন (sitting) মেয়রের মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা। তবে এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত যেমন একদিকে নারী অধিকার ও কর্মপরিবেশের সংস্কার নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে তেমনি দেশটিতে তীব্র সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
ইতিহাস গড়ার নেপথ্য কাহিনি
২০২৩ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে জাপানের কনিষ্ঠতম নারী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন শোওকো কাওয়াতা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তার প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার কথা রয়েছে। ইয়াওয়াটা শহরের সাধারণ কর্মীদের জন্য ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটির বিধান থাকলেও, নির্বাচিত মেয়রদের ক্ষেত্রে আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো ছিল না। ফলে এই নজিরবিহীন পদক্ষেপে তাকে নিজেই একটি ছুটির রূপরেখা তৈরি করতে হয়। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি মোট ১৬ সপ্তাহ—প্রসবের আগে ৮ সপ্তাহ এবং পরে ৮ সপ্তাহ—ছুটিতে থাকবেন। তবে অনুপস্থিতির সময়েও তিনি জরুরি প্রশাসনিক কাজগুলো সমন্বয় করবেন বলে জানিয়েছেন।
নেপথ্যের বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড়
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও জাপান দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনমিতিক সংকট বা জন্মহার হ্রাসের সমস্যার সঙ্গে লড়ছে। তা সত্ত্বেও একজন শীর্ষ স্থানীয় রাজনৈতিক নেত্রীর মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়াকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি রক্ষণশীল সমাজের একটি অংশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাওয়াতার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের একাংশের দাবি, জনপ্রতিনিধিদের পদে থেকে ব্যক্তিগত জীবনের জন্য বিরতি নেওয়া করদাতাদের অর্থের অপচয় এবং এটি তাদের মূল দায়িত্বের প্রতি এক ধরনের অবহেলা। এছাড়া শতভাগ বেতন নিয়ে ছুটিতে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
নেত্রীর প্রতিক্রিয়া ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
এমন সমালোচনার মুখে হতাশা প্রকাশ করে মেয়র কাওয়াতা বলেন, “যারা আমাকে আগে চিনত না, তারা শুধু এই ছুটির খবরের মাধ্যমেই আমাকে জেনেছে। অনলাইনে কিছু মানুষ সমালোচনা করে বলেছেন যে আমি নাকি আমার কাজ করছি না, কেবল ছুটি ভোগ করতেই সেখানে আছি—যা সত্যিই হতাশাজনক।”
তিনি আরও বলেন, “সমাজ মুখে জন্মহার বাড়ানোর কথা বললেও বাস্তবে মাতৃত্বকে এখনও ব্যক্তিগত দায় হিসেবে দেখা হয়। সমাজ সন্তানকে স্বাগত জানায়, কিন্তু জন্ম প্রক্রিয়াকে সহজভাবে গ্রহণ করতে চায় না।”
বিশ্লেষকদের মতে, নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডার্নের মতো বিশ্বনেতারা রাজনীতি ও মাতৃত্বের ভারসাম্য যেভাবে রক্ষা করেছিলেন, কাওয়াতার এই পদক্ষেপ জাপানের পিতৃতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামোয় সেই পরিবর্তনের দরজাই খুলে দিয়েছে। জন্মহার কমার এই সময়ে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির এই মাতৃত্বকালীন ছুটি জাপানের কর্মসংস্কৃতি ও লিঙ্গসমতার দীর্ঘমেয়ায়ী লড়াইয়ে একটি বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।