বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করেছে। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সরকার ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন করা হবে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আরেকটি ঘোষণা কি সত্যিই মানুষের জীবন বাঁচাবে, নাকি কার্যকর বাস্তবায়নই হবে প্রকৃত পরিবর্তনের চাবিকাঠি? ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই ঘোষণার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে এর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট, অর্থনৈতিক ক্ষতির উৎস এবং মানবিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। প্রতিদিন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, শিশু ও সাধারণ পথচারী সড়কে প্রাণ হারান কিংবা চিরস্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হন। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি ভেঙে যাওয়া পরিবার, একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি। এমন প্রেক্ষাপটে একটি আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা আইন অবশ্যই সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে কেবল নতুন আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, দেশে অনেক ভালো আইন রয়েছে, কিন্তু দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে সেগুলোর কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না। তাই নতুন আইনের শক্তি নির্ভর করবে এর কার্যকর প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর।
সরকার যে "Safe System Approach"-এর কথা বলেছে, সেটিই হওয়া উচিত ভবিষ্যৎ নীতির ভিত্তি। এই ধারণার মূল কথা হলো—মানুষ ভুল করবেই, কিন্তু সেই ভুল যেন মৃত্যুর কারণ না হয়। অর্থাৎ নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, দায়িত্বশীল চালক এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বিশ্বের যেসব দেশ সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে, তারা এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রথমত, গতিসীমা বাস্তবায়নকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। শুধু সাইনবোর্ড বসিয়ে নয়, ক্যামেরা, ডিজিটাল নজরদারি এবং স্বয়ংক্রিয় জরিমানার মতো ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি তার কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স প্রদান এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, নগর ও মহাসড়কের নকশায় পথচারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একই সঙ্গে তথ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, স্থান, সময় এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা সম্ভব নয়। একটি জাতীয় সড়ক দুর্ঘটনা ডাটাবেস নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে নাগরিকদের ভূমিকাও কম নয়। ট্রাফিক আইন মানা, অতিরিক্ত গতি এড়ানো, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি না চালানো এবং পথচারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন—এসব অভ্যাস গড়ে তোলা ছাড়া কোনো আইনই সফল হবে না। সড়ক নিরাপত্তা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিক সংস্কৃতিরও একটি অপরিহার্য অংশ।
সরকারের ঘোষণায় আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা গ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতা ও গবেষণালব্ধ তথ্যকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। নীতিনির্ধারন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, পরিবহন খাত, নাগরিক সমাজ এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হলে আইন আরও কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হবে।
আজ বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে যদি সত্যিকার অর্থে একটি আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণীত হয় এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, তবে হাজারো প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু যদি এটি কেবল আরেকটি ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সড়কে রক্ত ঝরার মিছিল থামবে না।
অতএব, এখন সময় প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে যাওয়ার। নিরাপদ সড়ক প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে আইন, প্রশাসন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত প্রয়াসই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বহু বছর ধরেই জননিরাপত্তার অন্যতম বড় সংকট। প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবার সড়কে স্বজন হারাচ্ছে, কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করছে, আবার কেউ হারাচ্ছে জীবিকার প্রধান অবলম্বন। এ বাস্তবতায় জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রাক রোডসেফটি প্রোগ্রাম।