জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় এটি স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বাজেটের আকার বড় হওয়াটাই সাফল্যের মাপকাঠি নয়। মূল প্রশ্ন হলো-এই বাজেট কতটা বাস্তবসম্মত, কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কতটা বাস্তবায়নযোগ্য।
প্রস্তাবিত বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ বাড়ানোর উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বাজেটে পরিচালন ব্যয়ের আধিক্য নিয়ে সমালোচনা ছিল। এবার উন্নয়ন ব্যয়ের অনুপাত বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি অর্থনীতিকে উৎপাদনমুখী ও ভবিষ্যতমুখী করার একটি ইতিবাচক সংকেত।
বিশেষ করে ক্যানসারের ওষুধ, ডায়ালাইসিস সেবা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য, সৌরবিদ্যুৎ উপকরণ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর কর ও শুল্ক হ্রাসের প্রস্তাব সময়োপযোগী। ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ জ্বালানি এবং জনস্বাস্থ্য-এই তিনটি খাত আগামী দশকের উন্নয়নের চালিকাশক্তি হতে পারে। বাজেটে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা গেছে।
একই সঙ্গে কৃষি, প্রাণিসম্পদ এবং মৎস্যখাতের উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে কিছু কর ছাড়ের উদ্যোগও প্রশংসার দাবি রাখে। খাদ্য নিরাপত্তা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় এগুলোর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবে বাজেটের শক্তির পাশাপাশি দুর্বলতার জায়গাগুলোও স্পষ্ট।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রাজস্ব আহরণ নিয়ে। প্রায় ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলে,রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ও বাস্তব অর্জনের মধ্যে প্রায়ই উল্লেখযোগ্য ব্যবধান থেকে যায়। কর প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কার,কর ফাঁকি রোধ এবং করজালের সম্প্রসারণে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজেট ঘাটতি। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি ঘাটতি পূরণের জন্য দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো হয়েছে। উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে ঘাটতি বাজেট অস্বাভাবিক নয়,কিন্তু ঋণনির্ভরতা যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। ফলে সরকারের অর্থসংস্থানের কৌশল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নীতি। সিগারেট, নিকোটিন পাউচ এবং হিটেড টোব্যাকো পণ্যে কর বাড়ানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক বলা যায়। তবে একই সময়ে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যাতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি না করে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর ফলে সরকারের ব্যয় কতটা বাড়বে এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী হবে, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
এ বাজেট নিয়ে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মূল্যায়নে স্বাভাবিকভাবেই ভিন্নতা রয়েছে। সরকার এটিকে উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও জনকল্যাণমুখী বাজেট হিসেবে উপস্থাপন করছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, ঋণনির্ভরতা, মূল্যস্ফীতি এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই বিতর্ক স্বাভাবিক; বরং তা বাজেটকে আরও পরিশীলিত করতে সহায়তা করে।
তবে একটি বিষয়ে সরকার, বিরোধী দল, অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে-দুর্নীতি, অপচয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা দূর না হলে কোনো বাজেটই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি,কর্মসংস্থান,বৈদেশিক মুদ্রার চাপ,বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই বাস্তবতায় বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে কেবল ঘোষণার ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের দক্ষতা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে তাই একদিকে সম্ভাবনার বাজেট বলা যায়, অন্যদিকে এটি একটি কঠিন পরীক্ষারও নাম। আগামী এক বছর প্রমাণ করবে-এটি কেবল একটি উচ্চাভিলাষী দলিল ছিল, নাকি সত্যিই অর্থনীতিকে নতুন গতি দেওয়ার কার্যকর রূপরেখা।
লেখকঃ সম্পাদক-সকালের আলো ডট কম, সোস্যাল এক্টিভিস্ট,