শনিবার, মে ৩০, ২০২৬

ফুটবলের দোলাচাল শুধু খেলায় নয়,ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক এবং খেলোয়াড় ভিত্তিক

  • শৌল বৈরাগী
  • ২০২৬-০৫-২৯ ২৩:২৬:৪৬

আর মাত্র কয়েকদিন (১২ জুন) বাকি ফিফা বিশ^কাপ ফুলবল শুরু হতে। ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে জার্সি, পতাকা, বিভিন্ন দেশ সমন্ধে আলোচনা। সোসাল মিডিয়াতে রীতিমত নিজ নিজ সমর্থিত জার্সি এবং পতাকা নিয়ে প্রচারনা। কেউ নিজে জার্সি পরে কেউবা আবার পারিবারিক ভাবে কোন নিদিষ্ট দলের পোশাক পরে আবার কোথাও কোথাও দলগত ভাবেও পোষাক পতাকা হাতে নিজে ছবি পোষ্ট করে তার প্রিয় দল/দেশ বা খেলোয়াড়ের নাম নিয়ে শুরু হয়ে গেছে উন্মাদনা। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে উত্তেজনা ও উন্মাদন ততই বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। গত ২০২২ বিশ^কাপ পর্যন্ত ৩২টি দেশ ফিফা বিশ^কাপ ফুটবল খেলার সুযোগ পেত। তবে চলতি বছরে খেলবে ৪৮টি দেশ। 
উন্মাদনা হবে আরো বেশী। বিষয়টি এমন নয় যে, শুধুমাত্র যে দেশগুলো খেলায় সুযোগ পেয়েছে বা খেলবে - উন্মাদনা বা উত্তেজনা বা প্রচার প্রচারণা সে দেশগুলোর মধ্যে সীমিত থাকবে। বরং দেখা যায় যে বাংলাদেশের মত দেশগুলোও যারা খেলার সুযোগ পায় না তাদের মধ্যে উন্মাদনা আরো বেশী। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বাংলাশের বিশ^কাপ ফুটবল নিয়ে উন্মাদনার কথা। বাংলাদেশ বিশ^কাপে খেলে না ঠিকই কিন্তু সাপোর্টার বা উন্মাদনা এত বেশী থাকে যে, মনে হয় বাংলাদেশই বিশ^কাপে খেলছে। পাগলা সাপোর্টার! কত যে পাগলামি হয় তা বলে শেষ করা যাবে না। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি বাড়ীতে, অলিতে গলিতে উড়তে দেখা যায় সমর্থিত দেশের পতাকা। এমনকি কোন কোন বাড়ীর পুরো দেয়ালে সমর্থিত দেশের পতাকায় রং করা হয়, পতাকা আঁকা হয়। এই ফুটবল উন্মাদনাকে কেন্দ্র করে জার্সি, পতাকা, রং করা, কে কত উর্দ্ধে পতাকা উত্তোলোন করতে পারে, এমনকি ৩/৪ মাইল দীর্ঘ পতাকা তৈরীতেও খরচ হয়ে যায় কোটি কোটি টাকা। এইতো মাত্র কয়েক বছর আগে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল এবং জার্মানীর দীর্ঘ পতাকা বানাতে গিয়ে নিজ পৈতৃক জমিও বিক্রি করেছে। আনন্দের পাশাপাশি অন্যদিকে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ,টেলিভিশন ভেঙ্গে ফেলা,মারামারি,এমনকি হতাহতের ঘটনাও এই বাংলাদেশে ঘটেছে। হায়রে উন্মাদনা! 
বাংলাদেশের সমর্থকদের মধ্যে প্রধানতঃ দু’টি দেশকেই বেশী সমর্থন করে বা সমর্থক আছে। আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল। দু’টো দেশই ল্যাটিন আমেরিকার। তবে অন্য দেশগুলোর যে সমর্থক নেই এমনটি নয়। যেমন জার্মানী, ইটালি, ফ্রেন্স, স্পেন, এশিয়া মহাদেশের দেশ হিসেবে জাপান, দক্ষিন কোরিয়া, ইরান ইত্যাদি দেশেরও, সৌদি আরব একটা বড় সমর্থক বাংলাদেশে আছে। তবে যখন দু’টি দলের খেলা হয় তখন তার প্রিয় দল বা দেশের খেলা না থাকলে দুটির মধ্যে একটি বেছে নেয়। যেমন: মনে করেন জাপান এবং ইতালির মধ্যে খেলা-যার কোনটাই একজন সমর্থকের প্রিয় দল নয়। তখন এশিয়া মহাদেশ হিসেবে অধিকাংশই হয়তো জাপানকে আবার ইউরোপ হিসেবে অনেকেই হয়তো ইতালিকে সমর্থন দিয়ে থাকেন। তবে এটা শুধু খেলার দিনের জন্য। যেনম: যে দিন আমার কোন প্রিয় দলের খেলা না থাকে সেদিন আমি অধিকতর দুর্বল দলকে সমর্থন দিয়ে থাকি। 
বিশ^কাপের উন্মাদনা উত্তেজনা আবার অন্যভাবেও হয়ে থাকে। সমসাময়িক ঘটনা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, কোন বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কোন বিশেষ আলোচিত ঘটনা ইত্যাদিও বিশেষ উন্মাদনা ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে থাকে। এমন ঘটনারও খেলার আবেদন দেশ-কাল-পাত্র হিসেবে তৈরী হয়ে থাকে। 
আমি বিশ^কাপ ফুটবলের কথা প্রথম শুনি ১৯৭৮ সালে। একদিন আমার একজন প্রিয় শিক্ষক চিত্তরঞ্জন বিশ^াস (?) যিনি ইংরেজী এবং অংক পড়াতেন। সকালে ক্লাসে এসেই উনি ফুটবল খেলা এবং পেলেকে নিয়ে কিছু বলেছিলেন। তবে তখন বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে এমনকি আমার মনে হয় শহরেরও এতটা বেশী পরিচিত ছিল না। কারণ তখন আমার মনে পরে না যে, ২/৪টা গ্রামের মধ্যে কোথাও টেলিভিশন ছিল। আর পত্র পত্রিকাও সেখানে পাওয়া যেত না। তবে শিক্ষক মহাশয় যে, ফুটবল নিয়ে কিছু বলেছিলেন তা বুঝতে পেরেছি; কিন্তু ্ওটা যে বিশ^কাপ ফুটবল সে বিষয়ে কোন ধারণাই ছিল না। তাই খুব যে একটা মনোযোগ দিয়ে শুনেছি বা বুঝেছি তা বলা যাবে না। তবে কিছুটা পরিচিত হই ১৯৮২ বিশ^কাপে। তখন শহরে। হোষ্টেলে প্রতিদিন খবরের কাগজ পেতাম সেখান থেকে এবং সিনিয়র কয়েকজন ভাই ছিল তাদের সাথে আলোচনায় বিশ^কাপ ফুটবল বিষয়ে কিছুটা বুঝতে শুরু করেছিলাম। প্রতিদিন খবরের কাগজে খেলার খবরগুলো নিয়মিত পড়তাম। তবে সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯৮২ সালের ইতালি এবং পশ্চিম জার্মানীর মধ্যেকার ফাইনাল খেলা টিভিতে দেখার। এর পরেই আসে ১৯৮৬ বিশ^কাপ। শুরু হয় ম্যারাডোনা যুগ। যদিও ম্যারাডোনার বিশ^কাপ অভিষেক হয়েছিল ১৯৮২ সালে। যেমনটা আমি উল্লেখ করেছি বিশ^কাপ ফুটবলে সমর্থকদের কখনো কখনো কোন ঘটনা বিশেষভাবে কোন দলের প্রতি বিশেষ আবেদন ও সহানুভূতি সৃষ্টি করে। আমি আমার দেখা ফুটবলগুলোর মধ্যে দু’ট বিশ^কাপের বিশেষ আবেদনের কথা তুলে ধরবো। তবে দু’টি বিশ^কাপই আর্জেন্টিনার সাথে জড়িত। পাঠক হয়তো মনে করবেন যে, আমি হয়তো আর্জেন্টিনার সমর্থক তাই আর্জেন্টিারই দু’টো আবেদনের কথা উল্লেখ করছি। হ্যাঁ, আমি যদিও আর্জেন্টিনার সমর্থক তবে আবেদন দু’টি ছিল বিশ^ব্যপী। তবে বিশ^কাপ ২০২৬-ও যে একটি বিশেষ দেশের আবেদন এবং বিশেষ সমর্থনের কারন হতে পারে সে কথাও লেখার চেষ্টা করবো। তবে এটা হবে আমার সম্পূর্ণ প্রেডিকশন বা অনুমান নির্ভর।  
১৯৮৬ সাল। ফিফা বিশ^কাপ ফুটবল শুরু হয়ে গেছে। তখন ১৬টি দেশ নিয়ে ফিফা এই আয়োজন করতো। যে কোন খেলাধুলাতো শুধু আনন্দ দেয় না। এর সাথে সাথে বিশে^র প্রতিটি দেশের মিলন-ভ্রাতৃত্বও গড়ে উঠে। বিশে^র দেশগুলোর মিলনের এক অদ্ভুদ সম্মিলন হলো এই সব আয়োজন। এর মধ্যে অনেক রাজনৈতিক স্বার্থ এবং রেশারেশির সমাধানও সম্ভব। যা হোক ১৯৮৬ বিশ^কাপ আয়োজক দেশ ছিল মেক্সিকো। বলা হতো মেক্সিকো ৮৬। প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ড খেলা শেষ। কোয়ার্টার ফাইনাল এর ৮টি দল চুড়ান্ত। এই কোয়ার্টার ফাইনালে এসেই বিশ^ আবেদন এবং উত্তেজনা চরম আকারে পৌঁছে যায়। এই উত্তেজনা এবং আবেদনের পেছনে ছিল একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারন। বলে রাখা ভালো যে, এই বিশ^ আবেদনটি তৈরী হয়েছিল দু’টি দেশকে কেন্দ্র করে। আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ড। ফুটবল জগতে তখন আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ড দু’টি দেশই ছিল শক্তিশালী। আর্জেন্টিনা ১৯৭৮ এবং ইংল্যান্ড ১৯৬৬ চ্যাম্পিয়ান। আর্জেন্টিনা দলে আছে ম্যারাডোনাসহ বুরুচাগা, বাতিস্তা  (গোল মেশিন), ভালদানোসহ একঝাঁক তারকা। আন্যদিকে ইংল্যান্ড দলে ছিল গোলরক্ষক পিটার শিলটনসহ (৮৬ বিশ^কাপে কোয়ার্টার ফাইনালের পূর্বে কোন গোল ইংল্যান্ডের জালে যায় নাই) টেরি বুচার, ব্রায়ান, গ্যারি লিনেকারসহ শক্তিশালী টিম। দু’ুট দলই বিশ^কাপ জেতার সমর্থ রাখে। দেশ দু’টি কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি। মুখোমুখি সেটা বড় কথা নয়। যে কোন দেশই যে কোন দেশের মুখোমুখি হতে পারে। কিন্তু এই দুই দেশের খেলাটি তখন বিশ^কাপ মাঠ, গ্যালারী ও দর্শক-সমর্থকদের বাইরে গিয়ে সারাবিশে^ রাজনেতিক আলোচনা ও জয় পরাজয়ের হিসেব নিকেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কারণ এখানে ছিল একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক একি অতি পুরাণো প্রেক্ষাপট। 
যেমনঃআর্জেন্টিনার সন্নিকটে মাত্র ৪৮০ কিলোমিটার দূরে একটি আইল্যান্ড যার নাম ফকল্যান্ড। এটি প্রথমে স্প্যানিশদের অধীনে ছিল। ১৮৩৩ সালে এটি ইংল্যান্ড এর পূর্ণ দখলে চলে যায়। কিন্তু আর্জেন্টিনার যেহেতু এটা খুবই সন্নিকটে, সেহেতু আর্জেন্টিানাও শুরু থেকেই দাবী করে এসেছিল যে, ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার অংশ এবং ইংল্যান্ডকে কয়েকবার চাপও সৃষ্টি করেছিল আর্জেন্টিনার কাছে ফকল্যান্ড হস্তান্তর করার জন্য। কিন্তু অনেক আলোচনা এবং কুটনৈতিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করেও ইংল্যান্ডের শক্তি ও প্রভাবের জন্য সমাধান সম্ভব হয়নি। ইংল্যান্ডের এই তালবাহানার দরুন এক পর্যায়ে ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ১০ হাজার সেন্য ফকল্যান্ড দখলের জন্য প্রেরন করেন। এই সৈন্য প্রেরণে আর্জেন্টিনা সরকারের প্রতি সকল আর্জেন্টাইনদের সমর্থন ছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনার সৈন্যরা ব্রিটিশ সৈন্যদের তুলনায় ছিল দুর্বল এবং আস্ত্র-সস্ত্রেও দুর্বল। তাই সুসজ্জিত ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছে পরাজিত হয় এবং আর্জেন্টিনার একটি উল্লেখ যোগ্য সংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। এই হলো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। মাত্র চার বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং আর্জেন্টিনার পরাজয়, যখন কোয়ার্টার ফাইনালে দুই দল মুখোমুখি হয়, তখন বিশ^ব্যাপী আলোচনা শুরু হয়ে যায়। এর কারণ হলো তখন ম্যারাডোনা বিশে^র শ্রেষ্ট খেলোয়াড় এবং আর্জেন্টিনা ঐ বিশ^কাপে অন্যতম ফেভারিট দল। ম্যারাডোনা তখন ইতালী ন্যাপোলী ক্লাবে খেলতেন। ন্যাপোলী ক্লাবকে তিনি চ্যাম্পিয়ান করিয়েছেন। ফুটবল দুনিয়াতো বটেই বিশ^ব্যাপী ম্যারাডোনার নাম ডাক এবং পরিচিত। তাই বিশ^ব্যাপী আলোচনা শুরু হলো ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনা ইংলান্ডের কাছে হেরে গেলেও খেলার মাঠে কি ইংল্যান্ড জিততে পারবে? আর তখন আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড বলা হতো না, প্রচারণা হতো ম্যারাডোনা বনাম ইংল্যান্ড। সবাই মুখিয়ে ছিল ইংল্যন্ডকে কি এবার আর্জেন্টিনা ফুটবল মাঠে পরাজিত করে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে পারবে-তা দেখার জন্য। অন্য কথায়, ম্যারাডোনা কি পারবে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে? বিশে^র তাবৎ তাবৎ বিখ্যাত পত্রিকার শিরোনাম হওয়া শুরু করলো, ম্যারাডোনা বনাম ইংল্যান্ড, ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রতিশোধে আর্জেন্টিনা ইত্যাদি। আর সে সাথে বিশ^ব্যাপী আবেদন ও প্রার্থনা হয়ে উঠলো ম্যারাডোনার কাছে যেন ইংল্যান্ড হেরে যায়। ইংল্যান্ডের এই হেরে যাওয়া বা আর্জেন্টিনা বা ম্যারাডোনার জিতে যাওয়াই যেন পৃথিবীব্যাপী মানুষের একমাত্র চাওয়া-পাওয়া ও প্রার্থনা হয়ে উঠলো। তবে শুধু ১৯৮২ সালের ইংল্যান্ড আর্জেন্টিনার ফকল্যান্ড যুদ্ধই নয়; বরং ১৯৬৬ সালেও আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনাল ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয়। তখনও কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হয় যা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যায়। ঐ ম্যাটের স্মৃতিও আর্জেন্টিনা এবং সারাবিশ^কে আরো তাতিয়ে তুলে। 
তাবৎ বিশে^র এই উত্তেজনাকর এবং আর্জেন্টিনা যেন জিতে যায় এমন পরিস্থিতিতে এলো সেই দিন ২২ জুন, ১৯৮৬। খেলা মেক্সিকোতে। কিন্তু পুরো বিশ^ই যেন হয়ে গেছে এস্তাদিও আ্যাজটেকা ষ্টেডিয়াম বা আর্জেন্টিনা, অন্য কথায় ম্যারাডোনা। একমাত্র হয়তো ইংল্যান্ডই হয়তো চায় নি যে তারা হেরে যাক। বাকী বিশে^রই আবেদন ছিল যে আর্জেন্টিনা জিতে যায়। খেলা শুরু হলো টান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে। যেমন মাঠে যেমন উত্তেজনা, ঠিক তেমনি মাঠের বাইরেও। সবার চোখ টেলিভিশনের পর্দায়। পর্দায় আবার সবার দিকে নয়; ম্যারাডোনার দিকেই বেশী নজর। প্রথমার্ধের খেলা শেষ। ফলাফল গোল শূন্য। মাঠের ভেতরে এবং বাইরে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু। দ্বিতীয়ার্ধের ৫১ মিনিটেই ম্যারাডোনা এক বিতর্কিত গোল করলেন। ম্যারাডোনার হাত উঁচু এবং হেড করার ভঙ্গি। সবাই বলছে হাত দিয়ে গোল করছে। হয়েছেও তাই। কিন্তু যেহেতু রেফারি এবং সাইড রেফারি কারো নিকট হতে কোন সংকেত এলো না, তাই ফাইনাল সিদ্ধান্ত গোল। খেলার উত্তেজনা আরো বেড়ে গেল। পরবর্তীতে এ গোলেকে ম্যারাডোনা নিজেই নাম দিয়েছে ‘ঈশ^রের হাতের গোল’। ইংল্যান্ড আরো মরিয়া হয়ে উঠলো গোল পরিশোধ এবং খেলার মোড় ঘুরানোর জন্য। কিন্তু ঠিক পাঁচ (৫) মিনিট পর ম্যারাডোনা শক্তিশালী ইংল্যান্ডের ৫ জন সেরা ডিফেন্ডারকে অতিক্রম করে এবং সর্বশেষ ঐ বিশ^কাপের সেরা গোল রক্ষক পিটার শিলটনকে ফাঁকি দিয়ে শতাব্দী সেরা ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি করলেন। এই গোল ২০০২ সালে ফিফা কর্তৃক এক অনলাইন ভোটের মাধ্যমে ‘গোল অব দি সেঞ্চুরী’ আখ্যায়িত হয়। বিশ^ স্বস্তি পায়। সবাই বলতে শুরু করে ইংল্যান্ড বনাম ম্যারাডোনা প্রতিযোগিতায় আর্জেন্টিনার জয় হয়েছে এবং একজন ম্যারাডোনার নিকট একটি দেশ হেরে গেছে। পক্ষান্তরে ফকল্যান্ড যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছে। যদিও ইংল্যান্ড ৮১ মিনিটে একটি গোল পরিশোধ করে। উল্লেখ্য যে, ১৯৮৬ বিশ^কাপে ইংল্যান্ডের গ্যারি লিনেকার সর্বোচ্চ গোল করায় গোল্ডেন বুট লাভ করেন। এতটুকুই ছিল ইংল্যান্ডের শান্ত¡না।
২০০৬ সাল থেকে ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত বিশ^কাপসমূহ। এই বিশ^কাপগুলোতে মেসি সব সময়ই আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু। তিনি কালক্রমে হয়ে উঠেছেন বিশ^সেরা ফুটবলার। প্রতিটি বিশ^কাপেই সবাই মেসি তথা আর্জেন্টিনা যেন বিশ^কাপ জয় কওে এমনটাই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু কখনোই সফল হতে পারেন নি। ২০২২ বিশ^কাপে যেন আর্জেন্টিনা নয় কিন্তু মেসি যেন অন্ততঃ একটি বিশ^কাপ জয় করে। কারন ২০০৬ সালে মেসির প্রথম বিশ^কাপ হলেও ২০১০ থেকে মেসি বেশী পরিচিত এবং জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলতে থাকেন মেসির মধ্যে ম্যারাডোনা এবং পেলের একটা সংমিশ্রন আছে, তিনি এলিয়েন, তিনি ভিন গ্রহের খেলোয়াড়, ফুটবল জাদুকর - ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত হতে থাকেন। মেসি নিজে যেমন উঁচ্চতায় উঠেছেন ঠিক তেমনি তাঁর ক্লাব বার্সোলনাকেও এনে দিয়েছেন অনন্য উঁচুতায়। কিন্তু বিশ^কাপ যেন তার সাথে খেলা করছিল। ফুটবল দেবতা যেন তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ২০১৪ বিশ^কাপে তো খুব কাছে গিয়েও ফিরে এলেন খালি হাতে। সেবার ফাইনালে নির্ধারিত সময়ে গোল শূন্য থাকে। তবে অতিরিক্ত সময়ের খেলায় জার্মানির কাছে ১-০ (জার্মানি ১ আর্জেন্টিনা ০) হেরে কাপ আর ছোঁয়া হলো না। ফুটবল বিশে^র সমর্থকরাও হতাশ হয়। ২০১৮ সালে তো দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়। মেসি নিজেও ভেঙ্গে পরেন। মেসি অনেকটা হতাশা থেকেউ অনেকবারই জাতীয় দল এবং ফুটবল থেকে অবসর নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এমনকি একবার তো ঘোষণাই দিয়েছিলেন - আর নয়। এবার অবসর। যদিও এটা ঐ বিশ^কাপ আর্জেন্টিনাকে এনে না দিতে পারার হতাশা। তিনি ফুলবলের এমন কোন শিরোপা ছিল নাই যা অর্জন করেন নি। ফুটবলের সর্বোচ্চ সম্মান বিশে^র সেরা খেলোয়াড় পুরষ্কার ব্যালন ডি’অর সর্বোচ্চ ৮ বার জিতেছেন। গোল রেকর্ড, ক্লাবের শিরোপা সব খানেই তার বিশ^ রেকর্ড। শুধু ছিল না বিশ^কাপ জয়-বিশ^কাপ ছোঁয়া। এমনই পরিস্থিতিতে বিশ^কাপ ২০২২ হাজির। মেসির বয়স ৩৫। মেসি নিজে বিশ^কাপ খেলবেন কি খেলবেন না- তা নিয়েও ছিল দোলাচাল। আবার দলে জায়গা হবে কিনা, সে-ও এক আশংকা। কারন বয়স। আর ফুটবলে তো বয়স্কদের তেমন একটা সুযোগ হয় না - যেহেতু ফুটবল খেলতে কৌশলের সাথে সাথে শরীরের শক্তি ও ষ্টামিনা দরকার। কিন্তু পুরো আর্জেন্টিনা তো বটেই, সাথে পুরো বিশ^ও প্রচন্ড ভাবে চেয়েছিল যেন - মেসি খেলে এবং অধরাকে জয় করে। ২০২২ আর্জেন্টিনা দলের কোচ আরেক কিংবদন্তি স্কালোনি মেসিকে বিশ^কাপ চূড়ান্ত তালিকায় বাছাই করেছেন। আর পরবর্তী বিশ^কাপে মেসি হয়তো খেলবেন না- তা ধরেই নিয়েছিল বিশ^ব্যাপী মেসির সমর্থকরা। কারন ২০২৬ বিশ^কাপে তাঁর বয়স হবে ৩৯ বছর। তাই এ বয়সে ফুটবল না খেলাটাই স্বাভাবিক (নিশ্চিত হওয়া গেছে তিনি ২০২৬ ফুটবল চুর্ণামেন্ট খেলবেন-যদিও মেসির চোট একটা সমস্যা)। এ সব বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ২০২২ বিশ^কাপে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দু ছিলেন মেসি। তখন এত বেশী আলোচনা হয়েছিল যে, হয়তো শুধুমাত্র যারা তাঁর বিরুদ্ধে খেলছেন, শুধু তারাই হয়তো চায় নাই মেসি জিতে যাক। বাকী দুনিয়াই চেয়েছিল মেসি অন্ততঃ একবার বিশ^কাপ জিতে যাক। তা না হলে মেসির যতই অন্যান্য অর্জন, খ্যাতি সব হয়তো একদিন বিলীন হয়ে যাবে এবং ফুটবল দেবতা ও বিশ^কাপ নিজেও লজ্জায় মুখ লুকাবে। কারন মেসিকে বলা হয়ে থাকে সর্বকালে সর্বসেরা ফুটবলার। ফুটবল জগতের এমন কোন শিরোপা, অর্জন, গোল রেকর্ড কি ক্লাবে বা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছিল না, যা মেসি অর্জন করে নি। কিন্তু বিশ^কাপ না জেতার কারণে হয়তো তাঁর বিশ^সেরা ফুটবলার যা ফুটবল প্রেমিরাই তাকে সমর্থনের জন্য বলে আসছে, সেগুলো হয়তো একদিন হারিয়ে যাবে। তাই চাই একটা বিশ্¦কাপ। সারাবিশে^র ফুটবল প্রেমিকদের একটাই চাওয়া-মেসি যেন ২০২২ বিশ^কাপ জয় করে। ২০২২ বিশ^কাপে শুরু থেকে ভালো খেলে প্রত্যাশা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা এবং মেসিবাহিনী। বিশে^ এমন একটা থরথর ভাব যেন মেসির জিতে হবে না, তাকে বিশ^কাপটা দিয়ে দেয়া হোক (যদি ফিফার এমন নিয়ম থাকতো)। একজন ভিন গ্রহের খেলোয়াড়, ফুটবলের জাদুকর, ফুটবল জগতে এত রেকর্ডধারী, বিশ^কাপ তাঁর ছোঁয়া পাবে না-তা কি হয়! তা হলে তো বিশ^কাপ নিজেই লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা পাবে না। শেষ পর্যন্ত বিশ^ ফুটবল প্রেমীদের চাওয়া, প্রার্থনায় আর্জেন্টিনা তথা মেসি বিশ^কাপ জয় করলেন। না, কোন দয়ায় না। ভালো খেলে এবং মেসির একক ও দলীয় নৈপুন্যেই যোগ্যদল হিসেবেই জয় করলেন। ফুটবল দেবতা কুটিকুটি হাসলেন, ফুটবল দুনিয়া আনন্দে আত্মহারা। সবার মধ্যে একটা স্বস্তি, তৃপ্তির ঢেকুর। আবার ফুটবল বিশ^ কাঁন্নাও করলো। শোকের নয় আনন্দের কান্না। আর কাতারের ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় পোষাক পরিয়ে মেসির হাতে তুলে দেয়া হলো ফুটবলের সর্বোচ্চ শিরোপা। কাতার বিশ^কাপে আরো অনেক দেশই ছিল যাদের বিশ^কাপ জেতার সমর্থ ছিল। এর মধ্যে আরো তিন সেমিফাইনালিষ্ট মরোক্ক, ফ্রান্স, ক্রোয়েশিয়া তো বটেই।
এবার আলোচনা করা যাক, ২০২৬ বিশ^কাপ নিয়ে। এ বিশ^কাপে এমন কি কোন ঘটনা বা আবেদন কি আদৌ হবে। যারা দেশ, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে কোন একটি দল বা প্লেয়ারকে সমর্থন করবে? প্রত্যাশা কি করবে যে, আমার নিজ দেশ হেরে যাক; কিন্তু ঐ দল বা ঐ খেলোয়াডটি জিতে যাক! ঘয়তো হবে, হয়তো হবে না। তবে আমার একটি প্রেডিকশন (অনুমান) আছে। ২০২৬ বিশ^কাপে ইরান নিয়ে হয়তো এমন একটি আবেদন, নিবেদন, প্রার্থনা ফুটবল জগতে সৃষ্টি হতে পারে। কারন, সবারই জানা। ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ। ভূ-রাজনীতির এই যুদ্ধে শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রর ইরানে আক্রমন পৃথিবীর অনেক দেশ এবং যারা ধর্ম নয় বরং মানবিকতাকে বড় করে মূল্যায়ণ করে তারা আমেরিকার সমালোচনা করছে, ধিক্কার দিচ্ছে এবং ইরানের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছে। ভূ-রাজনীতি, মানবিকতা, নির্দিধায় মানুষ মারা ইত্যাদি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা পাওয়ার সাথে সাথে ধর্মীয়ও একটি বড় সহানুভূতিও পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও পাবে তা নিশ্চিত বলা যায়। তবে প্রশ্ন, বিশ^কাপে এর প্রভাব কি পরবে? অবশ্যই পরবে। প্রথমতঃ ইরান আমেরিকার থেকে সামরিক দিক দিয়ে দূর্বল এবং যুদ্ধ ইরান শুরু করে নি, দ্বিতীয়তঃ ধর্মীয় সহানুভূতি। কারন কয়েকটি মুসলিম দেশ ব্যতিত (কিন্ত ঐ সব দেশের সকল মুসলমান আমেরিকা বা ই¯্রায়েলকে সমর্থন করে না) সকল মুসলিম দেশ ও মুসলমান ইরানকে এবং ইরানে যে মানবিক বিপর্যয় হয়েছে সে জন্য সমর্থন করবে। যুদ্ধ বেেন্ধর আবেদনও আসতে পারে। আর তৃতীয় বড় যে কারন তা হলো ইরানের প্রথম পর্বে সবগুলো ম্যাচই আমেরিকায় তথা আমেরিকার দু’টি বড় রাজ্যে/ষ্টেটে। তার মধ্যে দু’ুট খেলাই হবে ক্যালিফোর্নিযার লস এঞ্জেলস স্টেডিয়ামে। যেহেতু খেলা আমেরিকায়, তাই ক্রীড়া কুটনীতি এবং ইরানকে সমর্থনের মধ্য দিয়ে বিশ^ আমেরিকাকে বোঝাতে চাইবে যে, আমেরিকা তুমি ভুল করেছো, যুদ্ধ বন্ধ করো। এই খেলাগুলোতে যতবেশী ইরানের সমর্থক হবে আমেরিকাকে তার নিজ দেশে ততবেশী বার্তাটি দিতে পারবে। শুধু স্টেডিয়ামে নয়; সমর্থক এবং পত্র-পত্রিকাগুলোও আমেরিকার উপর পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে। সবাই প্রত্যাশা এবং সমর্থন করবে যেন ইরান একের পর এক ম্যাচ জিতে যায় আমেরিকার মাটিতে। অথবা বিশ^কাপ ২০২৬ জিতে উঁচু করে আমেরিকাকে একটি বড় ধরণের চপেটাঘাত করতে পারে। বিশ^ হয়তো এই ফুটবল ঘিরে একাট্টা হয়ে যাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে এবং ইরানের পক্ষে। যদিও ইরানের ইউরেনিয়াম বিশে^র জন্য একটি মারাত্মক হুমকি এবং আমেরিকার আধুনিক সমরা¯্ররে নিকট হয়তো ইরান শিশু। তবে উত্তেজনা খেলার আগেও কোন অংশে কম হচ্ছে না। ইরানের ফুটবলার এবং কোচ-স্টাফদের ভিসা নিয়ে ইতিমধ্যেই জটিলতা শুরু হয়ে গেছে। আমেরিকা ভিসা প্রদান নিয়ে তালবাহানা শুরু করেছে। খেলা শুরু হওয়ার আর কয়দিনই বা বাকি! এখনো ইরানের ফুটবলারদের ভিসা নিশ্চিত হয় নি। আমেরিকার মাটিতে ইরান বেইস ক্যাম্প করে প্রাক্টিসও করতে পারছে না। যতদূর জানা যায়, ইরান দল এখন মেক্সিকোতে আছে, সেখানে প্রাক্টিস করছে। আদৌ আমেরিকা কি ভিসা দিবে নাকি দিবে না-এটাও অন্ধকারে। আবার ভিসা দিলেও কয়দিন আগে দিবে, কি ভাবে দিবে, কতজনকে দিবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। অতএব বলা যায়, আমেরিকা এবং ইরান ফুটবল নিয়ে যে বিশ^ ইরানের পক্ষে একাট্টা হয়ে যাবে-তা অনেকটাই নিশ্চিত। যদি ভিসা আমেরিকা না দেয়, তবে বলা হচ্ছে মেক্সিকো থেকে গিয়ে তারা খেলবে। ফুটবল বিশ^ আবেদনটা হয়তো থাকবে ইরানের পক্ষেই! 

শৌল বৈরাগীঃ
লেখক ও কলামিষ্ট
 


এ জাতীয় আরো খবর