বৃহস্পতিবার, মে ২১, ২০২৬

ঈদযাত্রায় মৃত্যুফাঁদ ফিটনেসবিহীন যানঃসড়কে লক্কর-ঝক্কর গাড়ির দৌরাত্ম্যে বাড়ছে প্রাণহানির শঙ্কা

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৫-২১ ১০:৫৭:২৮

পবিত্র ঈদুল আযহা ঘনিয়ে এলেই দেশের মহাসড়কগুলোতে বেড়ে যায় যানবাহনের চাপ। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, লেগুনা, মাহেন্দ্র, নছিমন-করিমন-সব মিলিয়ে সড়কে তৈরি হয় এক অস্থির পরিস্থিতি। আর এই অতিরিক্ত চাপের সুযোগে প্রতিবছরের মতো এবারও সড়কে নামছে অসংখ্য ফিটনেসবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন। ফলে ঈদযাত্রা আনন্দের বদলে পরিণত হতে যাচ্ছে আতঙ্ক, দুর্ভোগ ও মৃত্যুঝুঁকির যাত্রায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হলো ফিটনেসবিহীন যানবাহন। বহু পুরোনো, যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়িগুলো নিয়মিত মহাসড়কে চলাচল করলেও কার্যকর নজরদারির অভাবে সেগুলো থামানো যাচ্ছে না। ঈদের সময় যাত্রীচাপ বাড়লে এসব গাড়ি আরও বেপরোয়াভাবে সড়কে নামে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন টার্মিনালে দেখা যায়, বহু পুরোনো বাসে রং করে নতুন চেহারা দেওয়া হলেও ভেতরের যান্ত্রিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অনেক বাসের ব্রেক দুর্বল, চাকা ক্ষয়প্রাপ্ত, স্টিয়ারিং অনিরাপদ, লাইট ও সিগন্যাল অকার্যকর। তবুও অতিরিক্ত ভাড়ার লোভে এসব গাড়ি দূরপাল্লার রুটে নামানো হয়। যাত্রীরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সেসব যানবাহনে উঠছেন।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের আগে অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে গ্যারেজে পড়ে থাকা অচল বা অর্ধচল গাড়িও সড়কে নামানো হয়। অনেক মালিক সাময়িক মেরামত করে ফিটনেস ছাড়াই গাড়ি চালান। আবার কিছু ক্ষেত্রে জাল কাগজপত্র ব্যবহার করেও গাড়ি চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু যানবাহনের ত্রুটি নয়, অদক্ষ চালকও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। ঈদের মৌসুমে অতিরিক্ত ট্রিপের চাপ নিতে গিয়ে চালকদের অনেকেই টানা ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা গাড়ি চালান। ক্লান্তি, ঘুমঘুম অবস্থা ও অতিরিক্ত গতি দুর্ঘটনার আশঙ্কা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফিটনেসবিহীন গাড়ির সঙ্গে অদক্ষ বা ক্লান্ত চালকের সমন্বয় যেন চলন্ত মৃত্যুফাঁদ।
মহাসড়কগুলোতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীরা। সামান্য সংঘর্ষেও পুরোনো ও দুর্বল কাঠামোর বাসগুলো ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে। অনেক সময় জরুরি নির্গমন পথও সচল থাকে না। ফলে দুর্ঘটনার পর হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।
ঢাকার গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের আগে ভাড়া বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি গাড়ির মানও ভয়াবহভাবে নেমে যায়। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, 'গাড়ি দেখলে মনে হয় যেকোনো সময় ভেঙে পড়বে,কিন্তু যাওয়ার বিকল্প না থাকায় উঠতেই হচ্ছে।'
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর বিশেষ অভিযান চালানোর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সড়কে কাগজপত্র যাচাই হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী পরিবহন মালিকদের কারণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ঈদের আগে কয়েক দিনের অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সারা বছরজুড়ে কঠোর মনিটরিং, ডিজিটাল ফিটনেস যাচাই,স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা নজরদারি এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে নামালে মালিক ও চালক উভয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তারা আরও বলছেন, যাত্রীদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে ভ্রমণ এড়িয়ে চলা, অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী গাড়িতে না ওঠা এবং বেপরোয়া গতি দেখলে প্রতিবাদ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। প্রতি ঈদে যদি মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফেরে, তাহলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
আসন্ন ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করতে এখনই কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ,অদক্ষ চালকদের অপসারণ,বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো বন্ধ এবং প্রতিটি টার্মিনালে কার্যকর ভ্রাম্যমাণ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ঈদের আনন্দ আবারও রক্তাক্ত সড়ক দুর্ঘটনার শোকে ম্লান হয়ে যেতে পারে।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,ভাইস চেয়ারম্যান-নিরাপদ সড়ক চাই। 
০১৭১৬৪৯৩০৮৯।


এ জাতীয় আরো খবর