শুক্রবার, জুন ১২, ২০২৬

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও জীবিকার সংকট:বিকল্প আয়ের প্রয়োজনীয়তা ও নৈতিক সীমারেখা

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের
  • ২০২৬-০৬-১১ ২৩:২৮:৪৩

গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই স্তম্ভের অনেক অংশই আজ আর্থিক অনিশ্চয়তার চাপে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
কম বেতন, অনিয়মিত পারিশ্রমিক এবং চাকরির অনিশ্চয়তা দেশের বহু গণমাধ্যমকর্মীর পেশাগত জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। 
ফলে প্রশ্ন উঠছে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাংবাদিকদের  বিকল্প  আয়ের  পথ  কতটা  যৌক্তিক, গ্রহণযোগ্য এবং নৈতিক?
আর্থিক সংকটের বাস্তবতা-গণমাধ্যম খাতে কর্মরতদের একটি   বড়   অংশের   মতে,  সংবাদপত্র ও টেলিভিশন খাতে  অনেক  ক্ষেত্রেই  বেতন  কাঠামো বর্তমান বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 
বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের মধ্যে অনিয়মিত আয়,সম্মানীনির্ভর কাজ এবং চাকরির নিরাপত্তাহীনতা বেশি দেখা যায়।
ফলে  অনেক  সাংবাদিক  বাধ্য হয়ে লেখালেখির পাশাপাশি অনুবাদ, শিক্ষকতা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, জনসংযোগ, কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। 
তাদের মতে,এটি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং জীবন ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর বাস্তব প্রয়াস।
“পেটে খিদে নিয়ে সাংবাদিকতা কঠিন” সাংবাদিকদের  একটি  বড়  অংশ  মনে করেন,আর্থিক অনিশ্চয়তা সরাসরি পেশাগত স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলে। 
একজন  সাংবাদিক  যখন  জীবিকার  সংকটে  থাকেন, তখন ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ  অনুসন্ধানী  প্রতিবেদন প্রকাশ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন প্রবীণ সাংবাদিকের ভাষায়,“নৈতিকতা ধরে রাখা  তখনই  সহজ, যখন  পেটের চিন্তা  কম থাকে। আর্থিক চাপ বাড়লে আপসের পথও তৈরি হয়।”
বিকল্প  আয়ের  সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকদের জন্য কিছু বিকল্প আয়ের ক্ষেত্র নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। 
যেমন-  শিক্ষকতা  ও  প্রশিক্ষণ  কার্যক্রম, গবেষণা  ও মিডিয়া  স্টাডিজ, অনুবাদ  ও  কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট
প্রকাশনা ও সম্পাদনা,তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং সেবা,ক্ষুদ্র ও  নৈতিক  সীমার মধ্যে ব্যবসা তবে এসব ক্ষেত্রে একটি  গুরুত্বপূর্ণ  শর্ত  রয়েছে  সাংবাদিকতার   সঙ্গে স্বার্থের   সংঘাত   সৃষ্টি হয়   এমন   কোনো   কার্যক্রমে জড়ানো যাবে না।
স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকি- গণমাধ্যম  বিশ্লেষকদের   মতে, সাংবাদিকদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো “Conflict of Interest” বা স্বার্থের সংঘাত। 
উদাহরণস্বরূপ, কোনো সাংবাদিক যদি এমন কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, যার বিষয়ে তিনি সংবাদ পরিবেশন করেন, তাহলে তার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এ কারণে সাংবাদিকতার নৈতিক নীতিমালা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্প আয়ের সুযোগ থাকতে পারে,  তবে   তা   অবশ্যই   স্বচ্ছতা,  জবাবদিহি  এবং পেশাগত সততার সীমার মধ্যে থাকতে হবে।
কাঠামোগত সমস্যা: মূল সমাধান কোথায়?
শ্রম  অধিকারকর্মী  ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প আয়ের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সমস্যার মূল উৎস গণমাধ্যম শিল্পের কাঠামোগত দুর্বলতা।
তাদের মতে, নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি-
ন্যূনতম বেতন কাঠামো কার্যকর করা, নিয়মিত বেতন প্রদান নিশ্চিত করা,চাকরির নিরাপত্তা বৃদ্ধি সাংবাদিক কল্যাণনীতি বাস্তবায়ন,নৈতিক তদারকি ও জবাবদিহি জোরদার করা।
এসব  পদক্ষেপ বাস্তবায়িত না হলে সাংবাদিকতার মান, স্বাধীনতা এবং জনবিশ্বাস দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের পরিধি বিস্তৃত হলেও এর অর্থনৈতিক   কাঠামো  এখনও  পেশাগত  মানদণ্ড অনুযায়ী পুরোপুরি শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। 
ফলে অনেক তরুণ সাংবাদিক অল্পদিনে পেশা পরিবর্তন করছেন অথবা বিকল্প আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে,একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন, যেখানে   সাংবাদিকদের   ন্যায্য   বেতন    ও  পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত  করার পাশাপাশি সীমিত ও নৈতিক বিকল্প আয়ের সুযোগও স্বীকৃত থাকবে।
“পেটে খিদে নিয়ে সাংবাদিকতা জমে না”এই  বাস্তবতাকে  অস্বীকার  করার সুযোগ নেই। 
তবে এর সমাধান কেবল ব্যক্তিগত বিকল্প আয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ  নয়। গণমাধ্যম  খাতের  কাঠামোগত সংস্কার, ন্যায্য   পারিশ্রমিক   এবং  পেশাগত  নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হতে পারে টেকসই সমাধান।
অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ এবং নৈতিকভাবে দৃঢ় সাংবাদিকতাই একটি দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। 

 


এ জাতীয় আরো খবর