শুক্রবার, মার্চ ৬, ২০২৬

একুশের পথ ধরে: ভাষা,স্মৃতি ও আগামী প্রজন্মের দায়

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০২-২১ ১১:৫৯:১১

একুশ। এটি কেবল একটি তারিখ নয়; এটি একটি চেতনা,একটি প্রতিজ্ঞা,একটি ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত উচ্চারণ। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়,ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়-এটি আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।

রক্তে রচিত সূচনা
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির সেই দিনগুলোতে ভাষার প্রশ্ন ছিল অস্তিত্বের প্রশ্ন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নেমে আসা তরুণদের কণ্ঠরোধ করতে গুলি চলেছিল। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম-না-জানা অনেকেই আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ, আর সেই রক্তেই রচিত হয়েছিল বাঙালির অধিকারচেতনার প্রথম অধ্যায়।
ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে শুধু ভাষার স্বীকৃতি এনে দেয়নি; এটি গণতান্ত্রিক অধিকার,সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতার সংগ্রামকে বেগবান করেছে। একুশ তাই মুক্তিযুদ্ধেরও পূর্বভূমি।

শহীদ মিনার: প্রতীকের শক্তি
ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আজ কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি প্রতিরোধের প্রতীক। প্রতিবছর একুশের প্রথম প্রহরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ খালি পায়ে সেখানে যান। ফুলের পাপড়ি আর নীরব দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়ে তৈরি হয় এক অনন্য সংহতি।
এই আনুষ্ঠানিকতা কেবল রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নয়; এটি আবেগের পুনর্জাগরণ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত এক নৈতিক শিক্ষা-ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে আপস নয়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈশ্বিক বার্তা
বাঙালির ভাষা আন্দোলনের অনন্য ইতিহাস বিশ্বমঞ্চেও স্বীকৃতি পেয়েছে। ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার পর একুশ হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক। এখন এই দিনটি বিশ্বজুড়ে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুভাষিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে।
বিশ্বায়নের যুগে অনেক ক্ষুদ্র ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে। একুশের চেতনা তাই কেবল বাংলা ভাষার জন্য নয়; এটি সব মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষার আহ্বান।

ডিজিটাল যুগে ভাষার নতুন লড়াই
আজকের প্রজন্ম মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বড় হচ্ছে। প্রযুক্তির সুবিধা যেমন বেড়েছে, তেমনি ভাষার ব্যবহারেও এসেছে পরিবর্তন। ইংরেজি বা অন্য ভাষার প্রভাবের মাঝে শুদ্ধ ও প্রমিত বাংলার চর্চা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে।
তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাংলা ভাষাকে নতুন পরিসরও দিয়েছে। অনলাইন সংবাদপোর্টাল, ব্লগ, ই-বুক, কনটেন্ট ক্রিয়েশন-সবখানেই বাংলা ব্যবহারের সুযোগ বাড়ছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি?

আগামী প্রজন্মের দায়
একুশের চেতনা কেবল ফুল দেওয়া বা গান গাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তা যথেষ্ট নয়। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্যচর্চা ও প্রযুক্তিতে বাংলার বিস্তার।
পরিবারে শিশুর প্রথম শব্দ, শিক্ষাঙ্গনে পাঠ্যপুস্তকের ভাষা, গণমাধ্যমে উপস্থাপনার ধরন-সবখানেই ভাষার সঠিক ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। ভাষা চর্চা মানে কেবল ব্যাকরণ জানা নয়; ভাষার ভেতরে থাকা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মূল্যবোধকে ধারণ করা।

একুশ: অনন্ত প্রেরণা
একুশ আমাদের শেখায়,অধিকার আদায়ে সাহসী হতে হয়। একটি ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করা হয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। সেই ত্যাগের স্মৃতি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়-অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণই প্রথম প্রতিবাদ।
মহান শহীদ দিবস তাই শোকের দিন হলেও এটি একই সঙ্গে গৌরবের দিন। একুশের চেতনা যতদিন জীবন্ত থাকবে, ততদিন ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বাধীন চিন্তার পথ আলোকিত থাকবে।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট। 


এ জাতীয় আরো খবর