মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬

'নদীর বুকে ভাসমান বন-দ্বিতীয় পর্ব'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৭-২৭ ০৯:৫৮:১৫
ফাইল ছবি

বন্ধুরা, আজ পর্ব-৪১ প্রকাশিত হল। গত পর্বে আমরা নদীর বুকে ভাসমান এক জীবন্ত জগতের সন্ধান পেয়েছিলাম। আজ সেই ছোট্ট জগতের আরও গভীরে প্রবেশ করব। সেখানে লুকিয়ে আছে এমন এক ক্ষুদ্র প্রাণ,যার গুরুত্ব আকারের চেয়ে অনেক বড়।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
'প্রকৃতির গোয়েন্দারা'
পর্ব–৪১:

ভোরের নদী যেন আজ আরও শান্ত।
কুয়াশার পাতলা চাদর সরতেই করিম কাকার নৌকা আবার সেই ভাসমান বনের পাশে এসে থামল।
রাহি, অরণ আর শিসু আজ অনেক বেশি প্রস্তুত।
সঙ্গে আছে দূরবীন, একটি নোটবই আর একটি ছোট হাতলুপ।

বটদাদুর কথা তাদের মনে আছে।
'প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বিস্ময় অনেক সময় সবচেয়ে ছোট প্রাণীর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।'
নৌকা থেকে না নেমেই তারা ভাসমান সবুজ দ্বীপটির দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ শিসু ফিসফিস করে বলল,
-'দেখো... পাতাটা নড়ছে।'

রাহি ভেবেছিল বাতাসে নড়ছে।
কিন্তু না।
একটি ছোট্ট সবুজ ব্যাঙ ধীরে ধীরে পাতার ওপর উঠে এল।
তার চোখ দুটি কাঁচের মতো উজ্জ্বল।

অরণ মুগ্ধ হয়ে বলল,
-'এত ছোট ব্যাঙ আমি আগে দেখিনি!'
ঠিক তখনই একটি নীল ফড়িং এসে ব্যাঙটির সামনে বসতেই মুহূর্তের মধ্যে ব্যাঙটি জিভ বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলল।

শিসু অবাক হয়ে বলল,
-'ও এত ছোট, তবু নিজের খাবার নিজেই জোগাড় করছে!'

বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এলো,
-'প্রকৃতিতে ছোট বলে কেউ অপ্রয়োজনীয় নয়। প্রত্যেক প্রাণীরই একটি কাজ আছে।'

রাহি খাতায় লিখল,
'নতুন সূত্র-ছোট প্রাণীরা বড় ভারসাম্য রক্ষা করে।'

ঠিক তখনই তারা দেখল, ভাসমান বনের এক কোণে জড়িয়ে আছে ছিঁড়ে যাওয়া একটি মাছ ধরার নাইলনের জাল।
জালের ফাঁসে আটকে ছটফট করছে একটি ছোট কচ্ছপ।
শিসুর চোখ ভিজে উঠল।
'ওকে বাঁচাতে হবে!'
করিম কাকা খুব সাবধানে নৌকাটি কাছে নিলেন।
তিনি হাত দিয়ে নয়,একটি লম্বা বাঁশের সাহায্যে জালটি টেনে আনলেন,যাতে কচ্ছপটি আঘাত না পায়।
ধীরে ধীরে জালের ফাঁস খুলে দিতেই কচ্ছপটি পানিতে নেমে এক মুহূর্ত থামল।
মনে হলো, সে যেন একবার তাদের দিকে তাকাল।
তারপর সাঁতরে ভাসমান বনের নিচে হারিয়ে গেল।

সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

অরণ বলল,
-'মানুষের ফেলে যাওয়া একটি জাল কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে!'

করিম কাকা মাথা নাড়লেন।
'নদীতে ফেলে রাখা জাল অনেক সময় মাছ, কচ্ছপ, এমনকি পাখিও আটকে ফেলে। তাই পুরোনো জাল কখনো নদীতে ফেলে রাখা উচিত নয়।'
ঠিক তখনই একটি মাছরাঙা ডুব দিয়ে আবার উড়ে গেল।
দূরে পানকৌড়ি ডানা মেলে রোদ পোহাচ্ছে।
ভাসমান বনের নিচে ছোট মাছের ঝাঁক ছুটে বেড়াচ্ছে।

রাহির মনে হলো, এটি যেন একটি ভাসমান গ্রাম।
যেখানে প্রত্যেক বাসিন্দার নিজস্ব কাজ আছে।

বটদাদু মৃদু হেসে বললেন,
-'একটি বন শুধু মাটিতেই জন্মায় না। নদীর বুকেও জীবন তার নিজের ঘর বানিয়ে নিতে জানে।'

ফেরার আগে রাহি নোটবইয়ে শেষ একটি লাইন লিখল-
'যে পৃথিবীকে ভালোবাসে, সে বড় প্রাণীর মতোই ছোট প্রাণীকেও রক্ষা করে।'

দূরে সূর্যের আলো নদীর জলে সোনালি রেখা এঁকে দিল।
ভাসমান বনটি ধীরে ধীরে স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলল।
আর তিন বন্ধুর মনে জন্ম নিল নতুন প্রশ্ন-

এই ছোট্ট পৃথিবীকে কীভাবে আরও নিরাপদ রাখা যায়?

আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি নদী, খাল বা পুকুরে পুরোনো জাল, প্লাস্টিক বা ক্ষতিকর কোনো বস্তু ফেলব না এবং জলজ প্রাণীদের নিরাপদ আবাস রক্ষায় সচেতন থাকব।

সবুজ তথ্যঃ
অনেক সময় নদী বা হ্রদে ফেলে রাখা পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল দীর্ঘদিন পানিতে থেকে যায়। এগুলোতে মাছ, কচ্ছপ, পাখি ও অন্যান্য জলজ প্রাণী আটকে মারা যেতে পারে। তাই ব্যবহারের অযোগ্য জাল নিরাপদভাবে অপসারণ করা পরিবেশ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

চলবে...

বন্ধুরা, এই পর্বে আমরা শুধু রোমাঞ্চ নয়,শিশুদের জন্য একটি বাস্তব পরিবেশগত সমস্যা-পরিত্যক্ত মাছ ধরার জালের ক্ষতি সম্পর্কেও জেনেছি। এতে গল্পটি যেমন আবেগপূর্ণ হয়েছে, তেমনি বাস্তব জীবনের শিক্ষাও দিয়েছে।পর্ব-৪২ এ এই ভাসমান বনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় রাহি, অরণ ও শিসুর প্রথম ছোট্ট পরিবেশ-অভিযান শুরু হবে। 


এ জাতীয় আরো খবর