মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলা এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈদেশিক নীতির নতুন মোড় আবারো বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে। গত মাসে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কি ইরানে সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের সঙ্গে অংশ নেবেন-তখন তার উত্তর ছিল অস্পষ্ট: “আমি পারি, আবার নাও পারি। কেউই জানে না আমি কী করবো।”
এ ধরনের অনিশ্চিত বার্তা নতুন নয় ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে। কিন্তু চলমান সংকটে হোয়াইট হাউসের আচরণ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথাবার্তা পরিষ্কারভাবে ‘আনপ্রেডিক্টেবিলিটি ডকট্রিন’ বা ‘ধোঁয়াশার মতবাদ’-এর বাস্তব প্রয়োগ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের এই অস্থির, স্ববিরোধী নীতির মূলেই রয়েছে তার ব্যক্তিত্ব। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল রাজনৈতিক পলিসি নয়, বরং একধরনের কৌশলগত অস্ত্র। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক পিটার ট্রুবোউইৎজের মতে, “ট্রাম্প একটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত পররাষ্ট্রনীতি প্রক্রিয়া তৈরি করেছেন। এর ফলে সিদ্ধান্ত অনেকটাই তার মেজাজ ও পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।”
ট্রাম্পের একাধিক বৈপরীত্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত-ইরানে প্রথমে হামলা স্থগিত রাখা, পরে হঠাৎ করে হামলা চালানো-এই ধোঁয়াশার নীতিরই বহিঃপ্রকাশ।
এই আচরণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পরিচিত ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ নামে, যেখানে বিশ্বনেতা এমন আচরণ করেন, যেন তিনি অবিচার্য-যা তার প্রতিপক্ষকে সতর্ক বা বিভ্রান্ত রাখে। এই কৌশলের সফল প্রয়োগ ট্রাম্প করেছেন ইউরোপের কিছু মিত্র দেশের ওপর। উদাহরণস্বরূপ, গত মাসের ন্যাটো সম্মেলনে জোটের সদস্যরা প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ২.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করতে সম্মত হয়েছে-যা আগে কল্পনাও করা যায়নি।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এই নীতি কেবল মিত্রদের ক্ষেত্রেই কার্যকর কিনা। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ওভাল অফিসে ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সরাসরি চাপে ফেলেন। পরে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রকে খনিজ সম্পদ ব্যবহারে বিশেষ সুবিধা দিতে সম্মত হয়।
অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ট্রাম্পের হুমকি এবং প্রভাবের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে নির্লিপ্ত। ইরানের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের আচরণ ‘আনপ্রেডিক্টেবিলিটি ডকট্রিন’-এর সর্বোচ্চ চূড়ান্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বন্ধ করবেন। অথচ এখন ইরানে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা তার দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে অনিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুত্তে সম্মেলনের আগেই ট্রাম্পকে পাঠানো এক বার্তায় তাকে “প্রিয় ডোনাল্ড” বলে অভিহিত করেন এবং ইরান নিয়ে তার অবস্থানের প্রশংসা করেন। এমন তোষামোদ ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ফাঁস করেছেন-যা তার কাছে ক্ষমতার প্রমাণ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিই ট্রাম্প কৌশলের দুর্বলতা। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুলি নরম্যান বলেন, “ট্রাম্প প্রশংসা খুঁজে বেড়ান, এবং তার সিদ্ধান্তগুলো আবেগনির্ভর। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তার কৌশল সহজে অনুমেয় হয়ে ওঠে।”
ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে ইউরোপের নেতারা প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ালেও এটা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেসের মতে, ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ (যেখানে বলা হয়েছে, যেকোনো এক সদস্য আক্রান্ত হলে সবাই তাকে রক্ষা করবে)-এই প্রতিশ্রুতি এখন “লাইফ সাপোর্টে আছে।”
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তর থেকেই উঠে এসেছে সতর্কতা। তার সাবেক কমিউনিকেশনস ডিরেক্টর অ্যান্থনি স্কারামুচি বলেন, “তিনি (ট্রাম্প) যাকে ভালোবাসেন, তাকেও টেনে মাটিতে নামাতে দ্বিধা করেন না।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, এই নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মিশ্র হতে পারে। ধোঁয়াশা যদি অতিরিক্ত হয়ে ওঠে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে একজন বিশ্বনেতা নয়, বরং অবিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা শুরু হতে পারে। জুলি নরম্যান বলেন, “যদি মিত্ররা নিশ্চিত না হয় যে যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকবে, তাহলে তারা দূরে সরে যেতে পারে। ট্রাম্পের ‘একা চলো’ নীতি উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।”
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর ‘আনপ্রেডিক্টেবিলিটি ডকট্রিন’ একদিকে যেমন ইউরোপীয় মিত্রদের বাধ্য করেছে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যেতে, অন্যদিকে এটি শত্রুদের মনস্তত্ত্বে কতটা প্রভাব ফেলছে-সে প্রশ্ন খোলা থাকছে। তবে এটুকু স্পষ্ট, এই নীতির সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বের উপর-যা একদিকে শক্তি, আবার অন্যদিকে দুর্বলতাও।
কীওয়ার্ডসঃ
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি, ম্যাডম্যান থিওরি, ধোঁয়াশার মতবাদ, ট্রাম্প ইরান হামলা, ট্রাম্প ন্যাটো, ইউক্রেন ট্রাম্প সম্পর্ক, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদ, ট্রাম্প-পুতিন সম্পর্ক, ট্রাম্প জেলেনস্কি তিরস্কার, ট্রাম্প নীতির বিশ্লেষণ, ট্রাম্প আমেরিকা প্রথম নীতি, ন্যাটো প্রতিরক্ষা বাজেট, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ২০২৫