রবিবার, মে ৩১, ২০২৬

ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের শীতল বাতাসে ‘প্রতিরক্ষা জাহাজ’ চুক্তি বাতিল, চাপে ভারত

  • নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • ২০২৫-০৫-২৩ ১৫:৫৭:৩৪

ঢাকা: ২৩ মে ২০২৫
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারতের গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (GRSE)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ২১ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত তারই একটি বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কলকাতা-ভিত্তিক এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের জন্য একটি আধুনিক ও বৃহৎ টাগ বোট নির্মাণের কাজ করছিল, যা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ভারতীয় একাধিক সংবাদমাধ্যম।
২০২৩ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং GRSE-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় তৈরি হওয়ার কথা ছিল ৬১ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ৮০০ টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মহাসাগরগামী টাগ বোট, যার কাজ ছিল সমুদ্রপথে উদ্ধার অভিযান, আগুন নিয়ন্ত্রণ, দূষণ প্রতিরোধ ও বড় জাহাজকে টেনে আনা ইত্যাদি।
চুক্তি অনুযায়ী, এটি ২৪ মাসের মধ্যে সরবরাহ করার কথা ছিল এবং এটি ছিল ভারতীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশকে দেওয়া ৫০০ মিলিয়ন ডলারের লোনের প্রথম বড় প্রকল্প।
নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ক্রমেই এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষমতা শেষ হওয়ার পর ভারতে তৈরি হওয়া "নির্ভরতাকেন্দ্রিক কৌশল" নতুন প্রশাসনের নীতির সঙ্গে মেলেনি।
বিশেষ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসনের 'ব্যালান্সড ফরেইন পলিসি' ভারতের ঘনিষ্ঠ মহলে অস্বস্তি তৈরি করেছে।
সম্প্রতি ড. ইউনূস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ‘স্থলবেষ্টিত অঞ্চল’ হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশকে এর একমাত্র সমুদ্র প্রবেশদ্বার হিসেবে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে তিনি চীনকে এই অঞ্চল ব্যবহারের প্রস্তাব দিলে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি পণ্যের স্থলবন্দর পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।
এই নিষেধাজ্ঞার জবাবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
GRSE ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যারা নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের জন্য নিয়মিত জাহাজ নির্মাণ করে।
এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়: “আমরা নিশ্চিত করছি, বাংলাদেশ সরকার পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই ক্রয়াদেশ বাতিল করেছে।”
এটি শুধুই একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, না কি এর পেছনে বৃহৎ কূটনৈতিক বার্তা আছে—এ নিয়ে এখন চলছে জোরালো আলোচনা।
২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে ভারত বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা খাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দেয়, যা দিয়ে বিভিন্ন সামরিক ও নৌবাহিনীর প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল। এই চুক্তির আওতায় GRSE-এর টাগ বোট প্রকল্প ছিল অগ্রাধিকার তালিকায়।
নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা বোঝাপড়ার কাঠামো এখন কার্যত ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে চীন, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যাচ্ছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া টুডে, এনডিটিভি ও হিন্দু বিজনেস লাইনের মতো সংবাদমাধ্যমগুলো এই খবরটি 'ডিপ্লোম্যাটিক সিগনাল' হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিশেষ করে ড. ইউনূসের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'-এর প্রতি আগ্রহ এবং ভারতের প্রতি নরম নীতির বদলে কৌশলগত দূরত্ব তৈরির প্রচেষ্টা ভারতীয় কূটনীতিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ভারতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প এবং রাজনৈতিক কৌশলের জন্য একটি বার্তা—ঢাকা আর আগের মতো দিল্লির উপর নির্ভরশীল থাকতে রাজি নয়।
এটি শুধুমাত্র একটি জাহাজ ক্রয় বাতিল নয়, বরং কৌশলগত অগ্রাধিকারের পুনর্বিন্যাস।
বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য দ্রুত বদলাচ্ছে। বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতি ভারতের জন্য যেমন উদ্বেগের কারণ হতে পারে, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও এটি সুযোগ-নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে একটি বহুমাত্রিক কূটনীতির পথে যাত্রা।

 


এ জাতীয় আরো খবর