মাস্টার দা সূর্যসেনকে আমরা সবাই চিনি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যিনি ছিলেন বাংলাদেশের কান্ডারী!
তাঁরই আরেক সহযোদ্ধা বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম আরেকজন পুরোধা!
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে বিভিন্ন সময়ে প্রায় সাত বছর জেল খেটেছেন তিনি।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন কারীদের মধ্যে একমাত্র জীবিত যোদ্ধা ছিলেন তিনিই।
দেশের স্বার্থে কতটুকু কষ্ট তাঁরা করেছেন তা অকল্পনীয়! তারই কিছু অংশ তুলে ধরার সামান্য প্রয়াস -
বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর জন্ম ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে।
পিতা উকিল কামিনি কুমার চৌধুরী ও মাতা রমা রানী চৌধুরীর পঞ্চম সন্তান তিনি।
১৯২৯ সালে সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে পাস করেন। তিনি এসময় রায় বাহাদুর বৃত্তি পান।
তার আগেই ১৯২৭ সালে তিনি তৎকালীন বিপ্লবী দল যুগান্তরে যোগ দেন। ১৯৩৪ সালে ভারতের রাজপুতনা দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি অবস্থাতেই পরীক্ষা দিয়ে ইন্টারমিডিয়েটে প্রথম বিভাগে পাস করেন।
১৯৩৬ সালে ওই ক্যাম্পে বন্দি থাকাকালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করেন। ১৯৩৯ সালে ইংরেজিতে এমএ ও বিএল (আইনে স্নাতক) পাস করেন ইংরেজ সরকার কর্তৃক গৃহবন্দি অবস্থায়।
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার লুট করে ব্রিটিশদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন মাস্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিনোদ বিহারীসহ বিপ্লবী দলের বীর সৈনিকেরা।
২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে যুদ্ধ হয় মাস্টারদার বিপ্লবী বাহিনী এবং ব্রিটিশ আর্মি ও পুলিশের সঙ্গে। সেই যুদ্ধে শহীদ হন অনেক বিপ্লবী। বিনোদ বিহারীর কণ্ঠনালীতে গুলি লাগে। বেশ কিছুদিন গোপনে চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
১৯৩৩ সাল পর্যন্ত তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। আর তখন তাঁকে মৃত কিংবা জীবিত ধরিয়ে দিতে ব্রিটিশ সরকার ৫০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে।
১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি সূর্যসেনকে চট্টগ্রাম কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী। এ সময় সূর্যসেনের ঘনিষ্ঠ সহচর বিনোদ বিহারী সূর্যসেনের মৃত্যুতে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েন।
১৯৪০ সালে বিনোদ বিহারী চট্টগ্রাম কোর্টের আইনজীবী কিরন দাশের মেয়ে বিভা দাশকে বিয়ে করেন। বিভা দাশ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে বেলা চৌধুরী নামেই সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সালে ২৯ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
১৯৩৯ সালে বিনোদ বিহারী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৪৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হন বিনোদ বিহারী চৌধুরী। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি এমএলএ ছিলেন।
ব্রিটিশ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ আমলের প্রতিটি সময়েই তিনি সব ধরনের অন্যায়, অবিচার, অপশাসন, সাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবিরোধী সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রবীণ এই বিপ্লবী বিভিন্ন সময়ে লাভ করেছেন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননাসহ বিভিন্ন সংগঠনের সংবর্ধনা।
২০০০ সালে স্বাধীনতা পদকসহ লাভ করেন বহু সম্মাননা। সম্মাননার সঙ্গে যে আর্থিক সম্মানি দেয়া হয়েছিল তার কিছুই নিজের জন্য রাখেননি তিনি। রাউজানের নোয়াপাড়াতে মাস্টার দা’র যে বাস্তুভিটা রয়েছে তা দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করে সেখানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছেন।
১০ এপ্রিল ২০১৩ সালে তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। শ্রদ্ধাঞ্জলি।