সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২৬

স্মরণ-লে. কর্নেল কাজী নূরুজ্জামান,বীর উত্তম

  • মেসবা খান
  • ২০২৫-০৩-২৪ ১৫:৪৭:১৪

লে. কর্নেল কাজী নূরুজ্জামান সামরিক কর্মকর্তা এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার।
জন্ম ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ যশোরে। তাঁর পিতার নাম খান সাহেব কাজী সদরুল ওলা এবং মাতা রতুবুন্নেসা।
তিনি ১৯৩৯ সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪১ সালে আইএসসি পাস করেন। একই কলেজে ১৯৪৩ সালে কেমিস্ট্রিতে অনার্স ক্লাসে অধ্যয়নকালে কাজী নূরুজ্জামান রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে যোগ দেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিনি বার্মা এবং সুমাত্রায় মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৪৬ সালে তিনি পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর আহবানে রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি থেকে আর্মিতে চাকরি স্থানান্তর করে রয়্যাল ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দেন।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর কাজী নূরুজ্জামান পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।
১৯৪৯ সালে তিনি ইংল্যান্ডের রয়্যাল আর্টিলারী স্কুল থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহন শেষে কাশ্মির যুদ্ধে ঝিলাম সেক্টরে যোগদান করেন এবং একই সালে পাকিস্তানের নওশেরায় আর্টিলারী সেন্টার অ্যান্ড স্কুলে প্রশিক্ষক নিয়োজিত হন।
১৯৫০ সালে তিনি অফিসার ট্রেনিং স্কুলের ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 
কাজী  নূরুজ্জামান ১৯৫৬ সালে মেজর পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং ১৯৫৮ সালে স্টাফ কলেজ সম্পন্ন করেন। 
১৯৬২ সালে তিনি প্রেষণে ইস্ট পাকিস্তান ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনে (ইপিআইডিসি) যোগ দেন। এখানে পশ্চিম পাকিস্তানি আমলাদের সাথে মতবিরোধ দেখা দিলে ১৯৬৯ সালে তিনি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন এবং ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে কাজী নূরুজ্জামান ২৮ মার্চ দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক কাজী সফিউল্লাহর ব্যাটালিয়নে (ময়মনসিংহ) যোগ দেন।
৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেজর ও তদূর্ধ্ব পদবির কর্মকর্তাদের প্রথম সভায় কাজী নূরুজ্জামান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
মে মাসে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ব্যাচ ক্যাডেট নির্বাচনের জন্য গঠিত পর্ষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। এ সময়ে তিনি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সেনাপতি এমএজি ওসমানীর নির্দেশে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ৭নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হক ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে কাজী  নূরুজ্জামান ৭নং সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব লাভ করেন।
দিনাজপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চল, বগুড়া, রাজশাহী এবং পাবনা জেলা এই সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
কাজী নূরুজ্জামান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ক ও আহবায়ক হিসেবে গঠন করেন ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক কমিটি। তিনি স্বদেশ চিন্তা সংঘ, লেখক শিবির ও গণসংস্কৃতি ফ্রন্টের সদস্য ছিলেন।
স্বাধীনতা লাভের পরপরই কাজী নূরুজ্জামান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। 
আশির দশকে তিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সভাপতি ছিলেন। তিনি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। তাঁর এই দাবি আদায়ের আন্দোলনের কারণে তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ তাঁকে গ্রেফতার করে কারাবন্দি রাখেন।
১৯৮৫ সালে গঠিত 'মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্র' এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কাজী নূরুজ্জামান।
জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে রাজপথের আন্দোলনে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি  'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন' ও 'একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় কমিটি' আয়োজিত গণআদালতের অন্যতম বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৭ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম গঠনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল।
কাজী নূরুজ্জামান প্রতিক্রিয়াশীলতা বিরোধী সকল আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাদের সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির সমালোচনা করে তিনি বক্তব্য দেন।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্ব ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার কাজী নূরুজ্জামানকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।
কাজী নূরুজ্জামান সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখেছেন। তিনি 'সাপ্তাহিক নয়া পদধ্বনি' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে স্বদেশ চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতি, বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ: একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা। তিনি 'একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়' গ্রন্থের অন্যতম সম্পাদক।
ঢাকা সিটি কর্পোরেশন তাঁর নামে ঢাকার পান্থপথে একটি সড়কের নামকরণ করেছে 'বীর উত্তম কাজী নূরুজ্জামান সড়ক'।
ব্যক্তিজীবনে প্রয়াত ইমেরিটাস অধ্যাপক সুলতানা জামান তাঁর স্ত্রী। বিশিষ্ট সংস্কৃতিজন ও নৃত্যশিল্পী লুবনা মারিয়ম এবং নায়লা খান তাঁর সুযোগ্যা কন্যাদ্বয়। সঙ্গীতশিল্পী আনুশেহ আনাদিল তাঁর দৌহিত্রী।  
২০১১ সালের ৬ মে ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। শ্রদ্ধাঞ্জলি।
 

 


এ জাতীয় আরো খবর