রবিবার, মার্চ ৮, ২০২৬

জহুরী জহর চেনে

  • সকালের আলো প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০১-২৯ ০৮:৪৪:৪৫
মূল সাদাকালো ছবি ও তথ্যসূত্র: শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় (The Wall)

তখন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্যা রানু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক ব্যাচে বম্বের সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়েন সদ্য দিল্লি থেকে আসা কিশোরী- কবিতা কৃষ্ণমূর্তি। তবে তখন তিনি কবিতা নন, সারদা কৃষ্ণমূর্তি।
একদিন কলেজ সোশ্যালের ফাংশান হচ্ছে। সেখানে রানু ও সারদা একসঙ্গে গান পরিবেশন করছেন।
মঞ্চে গান গাওয়ার সময় সারদার চোখে পড়ে দর্শকাসনে বসে আছেন স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সারদার গান শুনে কিংবদন্তি জহুরির কান সেদিন চিনতে ভুল করেনি কিশোরী সারদার মধ্যে অন্তর্নিহিত প্রতিভা।
গান শেষে তিনি রানুকে ডেকে বললেন, "তোমার বন্ধুকে একবার ডেকো তো। আমার কাছে নিয়ে এস।"
রানু বলল— “ঠিক আছে বাবা। আমার এই নতুন বান্ধবী টা খুব ভালো গান গায়।”
কথামতো রানু সারদাকে নিয়ে এল বাবার কাছে।
সেই প্রথম হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নামক মহীরুহের এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে সারদা।
বিশালদেহী কিংবদন্তি মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে রীতিমতো ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল সারদা। ভয়ে চট করে পা ছুঁয়ে প্রণাম করল।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একটু নুয়ে মুচকি হেসে সারদাকে বললেন, "তুমি কি আমার সঙ্গে স্টেজে গান করবে? আমার মেয়ে রানু তো সব জায়গায় যেতে চায় না গাইতে আমার সঙ্গে। তুমি কি ইচ্ছুক? যাবে আমার সঙ্গে?”
এমন নামকরা একজন কিংবদন্তি শিল্পীর এহেন মিষ্টি নম্র কথা বলার ভঙ্গিতে সারদার ভয় ও কুন্ঠা তখন নিমেষে অর্ধেক হয়ে গেছে।
তবে স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের থেকে এমন প্রস্তাব পেয়ে কি করবে বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সারদা।
পাশে দাঁড়ানো তাঁর মামণি (মায়েরই মতো) প্রতিমা ভট্টাচার্য এগিয়ে এসে বললেন, "এ তো বিশাল বড় সুযোগ! আপনি যদি সারদাকে আপনার সঙ্গে গান করতে নেন, তাহলে তো ওর স্বপ্ন পূরণ হয়ে যাবে।"
মামণির উৎসাহে সারদা ঘাড় নেড়ে সেই প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন।
এই প্রথম সুযোগ যেন কবিতার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
কিছুদিন পর এক কলেজের অনুষ্ঠানে সারদাকে নিয়ে গাইতে এলেন হেমন্ত বাবু।
মাইকে ঘোষণা করা হল— এবার আপনাদের সামনে গান গেয়ে শোনাবে সারদা।
শুনেই দর্শকরা হৈহৈ করে উঠে 'তিতলি উড়ি উড় জো চালি' গাইতে অনুরোধ করতে লাগল।
সবাই ভুল করে ভেবেছিল বলিউডের অভিনেত্রী-গায়িকা সারদা গান করতে এসেছেন।
সারদা কাঁপা কাঁপা পায়ে স্টেজে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন— "আমি তো ওই সারদা নই, যিনি বৈজয়ন্তীমালার লিপে গেয়েছেন। আমি নতুন মেয়ে, লতা মঙ্গেশকরের গান গাইব হেমন্তদার সাথে।"
দর্শকের চিৎকার থামেই না!
অবস্থা সামাল দিতে হেমন্তবাবু নিজে স্টেজে উঠে গিয়ে বললেন — “ওর নাম সারদা কৃষ্ণমূর্তি। ও আপনাদের লতার গান গেয়ে শোনাবে। আমি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কথা দিচ্ছি! শুনে দেখুন। ভালো লাগবে।”
হেমন্তবাবুর আশ্বাসে শান্ত হল দর্শকরা।
অনুষ্ঠান শেষে স্টেজের পেছনে এসে হেমন্তবাবু বললেন— “না, তোমার এই ‘সারদা’ নামটা স্টেজের জন্য একদম চলবে না বুঝলে? পরে অনেক সমস্যা হবে। ওটা বদলাতে হবে”।
তখন প্রতিমা মামণিও ব্যাপারটা অনুভব করলেন। বললেন — আচ্ছা হেমন্তদা, ‘কবিতা’ নামটা কেমন হয়?
হেমন্ত বললেন — “একদম। পারফেক্ট! এটাই থাকবে!”
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কথাতেই সেদিনের অনামী সারদা থেকে হয়েছিলেন আজকের কবিতা; কবিতা কৃষ্ণমূর্তি।
তরুণ মজুমদারের “শ্রীমান পৃথ্বীরাজ” ছবির জন্য গান তৈরি করা হচ্ছে। 
ছবিতে ব্যবহৃত রবীন্দ্রসঙ্গীত “সখী ভাবনা কাহারে বলে”। নবাগতা নায়িকা মহুয়া রায়চৌধুরীর লিপেই বেশিরভাগ গানটা। তার জন্য গায়িকা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন লতা মঙ্গেশকর। গানের শেষের কয়েকটা লাইনে নায়িকার সঙ্গে গলা মিলিয়েছেন অথাৎ লিপ মিলিয়েছেন সন্ধ্যা রায়। সেই কয়েকটা লাইন লতাজীর সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে গাওয়ার জন্য গায়িকার খোঁজ চলছে।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ভাবলেন, এই সুযোগটা তিনি কবিতাকেই দেবেন।
যেমন ভাবা তেমন কাজ।
নিজেই ফোন করলেন কবিতা কৃষ্ণমূর্তিকে।
বললেন — “কবিতা, আগামীকাল তোমার কলেজে যাওয়ার দরকার নেই। তুমি রাজকমল স্টুডিওতে চলে এসো।” 
পরদিন কথামতো স্টুডিওতে হাজির কবিতা।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন।
কবিতা জিজ্ঞেস করল— “হেমন্তদা গানটা কার সাথে গাইব?”
হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আঙুল দিয়ে সামনে দেখিয়ে বললেন “ওই যে, লতা আসছে।”
শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল কবিতার। জীবনের প্রথম প্লে-ব্যাক তাও আবার কিংবদন্তী লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে!
যেমনটা হয়, ভয়ের চোটে গান রেকর্ডিংয়ের সময়ে কটা লাইন ভুলেই গেলেন কবিতা।
হেমন্ত বললেন— “কি হল? তুমি গাইলে না?”
লতাজি টের পেলেন কবিতার ভেতরের ভয়টা। তিনি চশমাটা হালকা নামিয়ে কবিতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। সেই চোখের ভাষায় মনে বল পেলেন কবিতা।
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও আশ্বস্ত করে বলেন, “ভয় পেয়ো না। তুমি পারবে।”
দক্ষিণ ভারতীয় কবিতা কৃষ্ণমূর্তির প্রথম প্লে-ব্যাক গান রেকর্ড হল। তাও আবার লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে। বাংলা ছবির জন্য—
“সখী ভাবনা কাহারে বলে
সখী যাতনা কাহারে বলে?
তোমরা যে বল দিবস রজনী
ভালবাসা ভালবাসা..
সখী ভালোবাসা কারে কয়?
সে কি কেবলই যাতনাময়...”


অতিরিক্ত গবেষণা, সংকলন ও চিত্র সম্পাদনা -কিছু কথা ॥ কিছু সুর

 


এ জাতীয় আরো খবর