বিশ্বজুড়ে উন্নত জীবন ও নিরাপত্তার আশায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে অভিবাসনের চেষ্টা করতে গিয়ে গত এক দশকে অন্তত ৪ হাজার ৪১৪ শিশু নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ উদ্বেগজনক চিত্র। সংস্থাটি বলছে, অসম্পূর্ণ তথ্য ও পরিচয় শনাক্ত করতে না পারার কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অভিবাসনপথে এসব শিশু নিহত বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশ, তীব্র গরম, পানিশূন্যতা এবং মানব পাচারকারীদের নির্যাতন তাদের প্রাণহানির অন্যতম কারণ।
সবচেয়ে বিপজ্জনক পথগুলোর একটি ভূমধ্যসাগরীয় রুট। উত্তর আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টায় দুই হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত ও আমেরিকা অঞ্চলের বিভিন্ন পথে অভিবাসনের চেষ্টায় অন্তত ৮৫০ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া সাহারা মরুভূমি ও হর্ন অব আফ্রিকার দুর্গম পথেও বহু শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
আইওএম ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া মরদেহ কিংবা নৌকাডুবির ঘটনায় নিখোঁজদের অনেকের বয়স ও পরিচয় শনাক্ত করা যায় না। ফলে নথিভুক্ত হিসাবের বাইরেও বহু শিশুর মৃত্যুর ঘটনা অজানা থেকে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব শিশুর বয়স শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, তাদের মধ্যে শতাধিকের বয়স পাঁচ বছরের কম। নথিভুক্ত ঘটনার প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে নিহত বা নিখোঁজ শিশু ছেলে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রায় ৫২ শতাংশ মরদেহের বয়স বা লিঙ্গ নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করা যায়নি।
আইওএমের হিসাবে, গত এক যুগে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮১ হাজার অভিবাসীর মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ হাজার ৮৬২টি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বয়সসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এই তালিকার মধ্যে কত শিশু রয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, ইতালি ও মাল্টায় পৌঁছানো অভিবাসীদের ১৯ শতাংশ ছিল শিশু। অথচ ওই পথে নথিভুক্ত মোট মৃত্যুর মাত্র ২ শতাংশকে শিশু হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তথ্যের এই ব্যবধান সমুদ্রে নিখোঁজ শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের জটিলতা তুলে ধরে।
আইওএম জানিয়েছে, শিশুদের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার তথ্যের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা, সংবাদমাধ্যম ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষ্য থেকে সংগ্রহ করা হয়। সরকারি চিকিৎসা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলেছেন, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ সীমিত থাকায় শিশুদেরও বিপজ্জনক পথে যাত্রা করতে হচ্ছে। প্রতিটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করা এবং তাদের পরিচয় শনাক্ত করা জরুরি। তথ্যের ঘাটতি দূর করা না গেলে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করাও কঠিন হবে।
এ পরিস্থিতিতে সীমান্তে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার, মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বয়স ও পরিচয় যথাযথভাবে নথিভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
শিশু অভিবাসী, মানব পাচার, ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন