বন্ধুরা, প্রকাশিত হল পর্ব-৩৯ 'রাতের অচেনা অতিথি' রহস্যের সমাপ্তি। আগের দুই পর্বে তোমাদের কৌতূহল তৈরি হয়েছে,আজ শুধু সত্য জানবে না-গ্রামের মানুষও একটি ভুল ধারণা থেকে মুক্ত হবে।
রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
'প্রকৃতির গোয়েন্দারা'
পর্ব-৩৯:
পরদিন বিকেলে রাহি, অরণ আর শিসু স্কুল থেকে ফিরছিল।
হঠাৎ তারা শুনতে পেল, গ্রামের মাঠে অনেক মানুষের ভিড়।
একটি পুরোনো বটগাছের নিচে সবাই জড়ো হয়েছে।
কারণ,আগের রাতেও পেঁচার ডাক শুনে কয়েকজন ভয় পেয়েছে।
কেউ বলছে,
-'এই পাখিটাকে তাড়িয়ে দিতে হবে।'
আবার কেউ বলছে,
-'এটা থাকলে অমঙ্গল হবে।'
রাহি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
অরণ এগিয়ে গিয়ে বলল,
-'আপনারা কি জানেন,পেঁচা কী খায়?'
লোকজন একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল।
কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারল না।
ঠিক তখনই গ্রামের কৃষি কর্মকর্তা সেখানে এসে পৌঁছালেন।
তিনি হাতে একটি ছবি দেখিয়ে বললেন,
-'এই পেঁচাটাই গত রাতে আপনারা দেখেছেন। এটি মানুষের কোনো ক্ষতি করে না। বরং ধানের ক্ষেতে ইঁদুরের সংখ্যা কমিয়ে কৃষকদের সাহায্য করে।'
রহমান চাচা এগিয়ে এসে বললেন,
-'আমি নিজের চোখে দেখেছি। এক রাতেই ও কয়েকটি ইঁদুর ধরেছে।'
শিসু হাসতে হাসতে বলল,
-'তাহলে পেঁচা তো আমাদের রাতের পাহারাদার!'
সবাই হেসে উঠল।
ঠিক তখনই হালকা বাতাসে বটপাতা দুলে উঠল।
বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এল,
-'যে প্রাণীকে আমরা না জেনে ভয় পাই,তাকে জানার পর অনেক সময় সবচেয়ে বড় বন্ধুও মনে হয়।'
গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক আবদুল করিম স্যার বললেন,
-'আজ থেকে আমরা কুসংস্কারের নয়, জ্ঞানের পথে হাঁটব। শিশুদের কাছ থেকেই আজ আমরা নতুন শিক্ষা পেলাম।'
সেদিনই গ্রামের মানুষ একটি সিদ্ধান্ত নিল।
কেউ পেঁচার বাসা নষ্ট করবে না।
পুরোনো ফাঁপা গাছ অকারণে কাটা হবে না।
ধানের ক্ষেতে অযথা বিষও ব্যবহার করা হবে না।
রাহি আনন্দে বলল,
-'তাহলেই তো পেঁচারা নিরাপদে থাকবে।'
অরণ যোগ করল,
-'আর ফসলও ভালো থাকবে।'
ঠিক সেই মুহূর্তে দূরের তালগাছের মাথায় একটি পেঁচা এসে বসল।
সে একবার ডেকে আবার নিঃশব্দে রাতের আকাশে উড়ে গেল।
মনে হলো, সে যেন গ্রামের মানুষের নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে গেল।
ফেরার পথে শিসু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
-'আগে রাত মানেই আমার কাছে ভয় ছিল। এখন মনে হয়,রাতও প্রকৃতির আরেকটি সুন্দর গল্প।'
বটদাদু মৃদু হেসে বললেন,
-'মনে রেখো, প্রকৃতির কোনো প্রাণীই অকারণে সৃষ্টি হয়নি। প্রত্যেকেরই একটি কাজ আছে। সেই কাজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর ভারসাম্য।'
রাহি তার ডায়েরিতে লিখল,
-'আজ আমরা শুধু একটি রহস্যের সমাধান করিনি। আমরা একটি ভুল ধারণারও অবসান ঘটিয়েছি।'
সেদিন রাতের আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলছিল।
আর গ্রামের মানুষ প্রথমবারের মতো পেঁচার ডাক শুনে ভয় পেল না।
তারা জানল,সেই ডাক প্রকৃতিরই একটি সুর।
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি কোনো প্রাণী সম্পর্কে কুসংস্কার ছড়াব না। প্রকৃতির প্রতিটি জীবকে জানব, বুঝব এবং রক্ষা করার চেষ্টা করব।
সবুজ তথ্যঃ
পেঁচা শুধু ইঁদুর নিয়ন্ত্রণেই সাহায্য করে না,একটি সুস্থ কৃষি পরিবেশ বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই পৃথিবীর অনেক দেশে কৃষিজমির আশপাশে পেঁচা সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বন্ধুরা,একটি রহস্যের সুন্দর সমাপ্তি হলো।পর্ব-৪০ থেকে আমরা আরও বড় একটি অভিযান শুরু করতে যাচ্ছি-'নদীর বুকে ভাসমান বন'
এবার রাহি, অরণ, শিসু ও বটদাদু এমন এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনার সন্ধানে যাবে,যেখানে নদীর মাঝে ভেসে থাকা কচুরিপানা,ঘাস আর ছোট গাছ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ক্ষুদ্র এক জীবন্ত জগৎ। সেখানে তারা আবিষ্কার করবে মাছ,পাখি,ব্যাঙ,ফড়িং ও অসংখ্য ছোট প্রাণীর আশ্রয়। এটি হবে রোমাঞ্চ, বিজ্ঞান ও প্রকৃতির সৌন্দর্যে ভরপুর এক নতুন অভিযান।প্রস্তুত থেক।