,মহেশখালী(কক্সবাজার)
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, বৈরী আবহাওয়া, পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কারণে কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর সার্বিক জনজীবন মারাত্মক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভার নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় হাজারো পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। কৃষিজমি, মাছের ঘের, লবণ মাঠ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি আদায়ের নামে কোনো ধরনের চাপ, ভয়ভীতি বা হয়রানি না করার জন্য সরকারি নির্দেশনা মতে এনজিও কর্মীদের প্রতি মানবিক আহ্বান জানিয়েছেন মহেশখালী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং মহেশখালী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সিলর দিদার আলম।
তিনি বলেন, "দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব। আজ যারা বন্যায় সর্বস্ব হারিয়েছেন,তাদের ওপর কিস্তির চাপ সৃষ্টি করা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ক্ষুদ্র ঋণের উদ্দেশ্য মানুষের জীবনমান উন্নয়ন,তাদের আরও সংকটে ফেলে দেওয়া নয়।" দিদার আলম বলেন, বন্যার কারণে অনেক পরিবারের উপার্জনের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষকের ক্ষেত পানির নিচে,জেলেরা বৈরী আবহাওয়ার কারণে সাগরে যেতে পারছেন না, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকান খুলতে পারছেন না এবং দিনমজুররা কাজের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমন বাস্তবতায় অনেক ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতার পক্ষে নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তিনি ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনাকারী এনজিওগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের তালিকা তৈরি করে বাস্তব অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে।প্রয়োজন হলে কিস্তি আদায় সাময়িক স্থগিত, সময় বৃদ্ধি, জরিমানা মওকুফ কিংবা পুনঃতফসিলের মতো মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত, যাতে দুর্যোগকবলিত পরিবারগুলো নতুন করে ঋণের বোঝায় জর্জরিত না হয়। তিনি আরও বলেন, "সরকার যখন দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে, তখন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোরও একই মানবিক দায়িত্ব পালন করা উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ।"
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মহেশখালীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা বিরাজ করছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছে।অনেকের ঘরের আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও গবাদিপশুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মাছের ঘের ভেসে যাওয়ায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফলে অধিকাংশ ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতার পক্ষে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা জানান, অতীতে বিভিন্ন দুর্যোগের সময় কিস্তি আদায়কে কেন্দ্র করে ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল। তাই এবারের বন্যা পরিস্থিতিতে এনজিও গুলো যদি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, তবে তা শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতারই পরিচয় হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে ঋণগ্রহীতা ও প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
সমাজসেবা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের মূল দর্শন হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচন। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের প্রতি নমনীয় নীতি গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাপনারও একটি স্বীকৃত মানবিক অনুশীলন।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। এ সময়ে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, এনজিও এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের জন্য কিস্তি পরিশোধে সময় বৃদ্ধি,পুনঃতফসিল, সহজ শর্তে নতুন কর্মসংস্থান ভিত্তিক ঋণ এবং পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তারা দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
এদিকে স্থানীয়রা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনাকারী সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, দুর্যোগকালীন সময়ে কোনো পরিবার যেন কিস্তির চাপে হয়রানি বা মানসিক নির্যাতনের শিকার না হয়। বরং মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরপাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।