শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬

তেরো বছরের দীর্ঘশ্বাস আর এক ফালি জমির আকুতি: মৃত্যুর প্রহর গুনছেন বৃদ্ধ সদর আলী ফকির

  • মো: মহিউদ্দিন,
  • ২০২৬-০৭-২৪ ১৫:২৫:৪২

নেত্রকোনা প্রতিনিধি:
চোখে ঝাপসা দৃষ্টি, শরীরে মৃত্যুর শীতল ছোঁয়া, আর বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলা একবুক আক্ষেপ—এই নিয়েই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিছানায় কাতরাচ্ছেন ৭৫ বছরের বৃদ্ধ সদর আলী ফকির। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রঘুনাথপুর মৌজার পৈতৃক ভিটেমাটি ও সম্পত্তি জালিয়াতিচক্রের কবল থেকে উদ্ধار করতে গিয়ে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরে আজ তিনি সর্বস্বান্ত। দীর্ঘ ১৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াই এখন এক মর্মান্তিক মানবিক ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। ​আদালত ও মামলার বিবরণ সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনা বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত ও ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট থেকে মোকদ্দমা নং-১৫৫৫/২০১৪ (ল্যান্ড সার্ভে) এর কার্যকরণ শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ (সংশোধনী-২০০৮) এর ১৪৫(এ) ধারার বিধান মতে রেকর্ড সংশোধনের দাবিতে এই বিচারপ্রার্থী লড়াই চলছে।​মামলার বিবরণে প্রকাশ, রঘুনাথপুর মৌজার তফসিলে বর্ণিত ভূমি দীর্ঘদিন ধরে বাদীপক্ষের পিতা-পিতামহ শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছেন। মূল মালিক মাযহোম ফকির ১৯৫৭ সালের ২৭ নভেম্বর রেজিস্ট্রিকৃত দলিলমূলে জমি ক্রয় করে বসবাস ও চাষাবাদ শুরু করেন। মাযহোম ফকিরের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী সদর আলী ফকির ও মনফর ফকির উক্ত সম্পত্তির আইনগত ওয়ারিশ সূত্রে মালিক হন।​কিন্তু অভিযোগের তীর বিবাদীপক্ষের বিরুদ্ধে—মৃত আবুল হোসেন ফকির অসৎ উদ্দেশ্যে বি.আর.এস জরিপকালে মাযহোম ফকিরের কোনো পুত্র সন্তান নেই মর্মে সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য দিয়ে 'সাজিয়া' নামক এক ভুয়া পুত্র সাজান। এর মাধ্যমে বি.আর.এস খতিয়ান নং-৫৯ প্রস্তুত করিয়ে মূল এস.এ খতিয়ান নং-৩৪ এর পৈতৃক সম্পত্তি কেটে বিবাদীদের নামে পৃথক খতিয়ান খোলার এই গভীর জালিয়াতি করা হয়।​আদালত: ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল, নেত্রকোনা।​মামলা নম্বর: মোকদ্দমা নং-১৫৫৫/২০১৪ (ল্যান্ড সার্ভে)।​কার্যকরণ শুরুর তারিখ: ১৪ আগস্ট ২০১৩।
​স্থান (মৌজা ও উপজেলা): রঘুনাথপুর, কেন্দুয়া,
নেত্রকোনা।​খতিয়ান ও জমির পরিমাণ: এস.এ খতিয়ান নং-৩৪, বি.আর.এস খতিয়ান নং-৫৯, মোট ১.৮৭ একর।
​প্রধান বিবাদীগণ: মিলন মিয়া, কাঞ্চন মিয়া, হারুন মিয়া, কাজল মিয়া (সর্বসাং-রঘুনাথপুর, কেন্দুয়া) ও অন্যান্য।
​জীবন সায়াহ্নে এক হৃদয়বিদারক মানবিক চিত্র ​যাঁদের রক্ত ও ঘামে এই পৈতৃক ভিটেমাটি গড়ে উঠেছে, জীবনের শেষ সময়ে এসে সেই মাটির অধিকার পেতেই যেন আকুল হয়ে আছেন সদর আলী ফকির। একসময়ে ভাঙারি কুড়িয়ে টুকিটাকি জিনিস বিক্রি করে এবং লোহালক্করের কাজ করে কোনোমতে দিনাতিপাত করলেও আজ তিনি পুরোপুরি শয্যাশায়ী ও মুমূর্ষু। জীবনের এই অন্তিম ক্ষণে এসেও তাঁর একটাই মাত্র আকুতি—মৃত্যুর আগে যেন তিনি তার পৈতৃক সম্পত্তিটুকু ফিরে পান এবং চোখের পলক ফেলার আগে নিজের ভিটায় শেষ নিঃশ্বাসটা ত্যাগ করতে পারেন। সমাজের বিবেকবান মানুষ ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো এই বৃদ্ধের বুকফাটা আর্তনাদ আজ চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলছে। এত বঞ্চনা ও দীর্ঘসূত্রিতার পরও দেশের আইন ও আদালতের ওপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস আজও বিন্দুুমাত্র কমে যায়নি।​এদিকে, মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তার আইনজীবীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলতে পারেননি এবং ফাইল দেখে জানাতে হবে বলে জানান। মামলার এই মন্থর গতি আর দীর্ঘসূত্রিতা বৃদ্ধ সদর আলীর শরীর ও মনকে চরমভাবে ভেঙে দিয়েছে। তবুও তিনি খাতার পাতায় এলোমেলো হরফে নানা তথ্য লিখে রেখেছেন—যদি অলৌকিক বা আইনসম্মত উপায়ে হলেও তিনি তার জবরদখল হয়ে যাওয়া সম্পদ ফিরে পান! এই ছোট্ট আশাটুকুই যেন মুমূর্ষু এই মানুষটার শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার একমাত্র অবলম্বন। ​স্থানীয় এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও আক্ষেপ, একটি প্রভাবশালী কুচক্রী মহল দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ভূমি জালিয়াতির জাল বুনে নিরীহ মানুষকে নিঃস্ব করে আসছে। এই মামলাটির দ্রুত সঠিক তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা না গেলে এলাকার মানুষের আইনের প্রতি আস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। মুমূর্ষু সদর আলী ফকিরের মতো প্রকৃত মালিকরা মৃত্যুর আগে যেন তাদের জীবনের শেষ অধিকারটুকু ফিরে পেয়ে একটু শান্তির সান্ত্বনা নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারেন—এটাই এখন সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক দাবি।


এ জাতীয় আরো খবর