রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
পর্ব-২৯:
বৃষ্টির পর আকাশ আজ একেবারে পরিষ্কার।
নীল আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। খালের পানি নেমে গেলেও নদী এখনো ভরাট। সকালের নাস্তা শেষ করেই রাহি, অরণ আর শিসু নদীর ঘাটে পৌঁছাল।
ঘাটে অপেক্ষা করছিলেন মাঝি কাকা।
-'চলো, আজ তোমাদের একটা জায়গা দেখাব। খুব বেশি মানুষ সেখানে যায় না।'
ছোট্ট নৌকাটি ধীরে ধীরে নদীর বুকে এগিয়ে চলল।
পথে শিসু পানিতে ভাসতে থাকা শাপলার দিকে তাকিয়ে বলল,
-'নদীর মাঝখানে এত সবুজ কেন?'
মাঝি কাকা হাসলেন।
-'আর একটু গেলেই বুঝবে।'
কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছাল নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা একটি ছোট্ট চরে।
চারদিকে কাশফুল, নলখাগড়া, কেয়া আর ছোট ছোট ঝোপ।
গাছে বসে আছে সাদা বক, মাছরাঙা আর পানকৌড়ি। দূরে বালুর ওপর কয়েকটি কচ্ছপ রোদ পোহাচ্ছে।
শিসু বিস্ময়ে বলল,
-'এ যেন নদীর মাঝখানে একটা ছোট্ট বন!'
ঠিক তখনই হাওয়ায় দুলে উঠল কাশফুল।
বটদাদুর কণ্ঠ যেন বাতাসে ভেসে এলো।
-'এগুলো শুধু চর নয়। অনেক প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়।'
রাহি নিচু হয়ে দেখল, বালুর ওপর ছোট ছোট পাখির পায়ের ছাপ।
অরণ বলল,
-'এখানে নিশ্চয়ই অনেক পাখি বাসা বানায়।'
বটদাদু বললেন,
-'নদীর এসব চর অনেক পাখির বিশ্রামের জায়গা। কেউ এখানে ডিম পাড়ে, কেউ দূর দেশ থেকে এসে কিছুদিন থাকে। আবার অনেক গাছের বীজও এখানে এসে জন্ম নেয়।'
হঠাৎ শিসু একটি চকচকে মোড়ক কুড়িয়ে নিল।
-'এটা এখানে এল কীভাবে?'
মাঝি কাকা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
-'নদীতে ফেলা ময়লা ভেসে ভেসে এখানে এসে জমে।'
রাহি বলল,
-'তাহলে এই সুন্দর জায়গাটাও বিপদে পড়তে পারে।'
চারজন মিলে চরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক,বোতল আর মোড়ক কুড়িয়ে বড় একটি বস্তায় ভরল।
তারা লক্ষ্য রাখল, যেন কোনো পাখির বাসা বা গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
ঠিক তখনই একটি মাছরাঙা দ্রুত পানিতে ঝাঁপ দিয়ে একটি ছোট মাছ ধরে আবার ডালে ফিরে এল।
শিসু হাততালি দিয়ে উঠল।
-'দেখো! ও যেন খুশি হয়ে আমাদের সামনে খেলাটা দেখাল!'
বটদাদু হেসে বললেন,
-'প্রকৃতি কখনো কথায় ধন্যবাদ দেয় না। সে তার সৌন্দর্য দিয়েই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।'
ফেরার সময় মাঝি কাকা বললেন,
-'এই চরের কথা সবাই জানে না। জানলেও সবাই এর যত্ন নেয় না।'
রাহি দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
-'আমরা বন্ধুদের নিয়ে আবার আসব। তবে বেড়াতে নয়, চরকে পরিষ্কার রাখতে।'
অরণ যোগ করল,
-'আর সবাইকে বলব, নদী শুধু পানি নয়। নদী মানে জীবন।'
সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে।
নৌকা ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে ফিরছে।
পেছনে রয়ে গেল নদীর বুকের সেই সবুজ দ্বীপ।
রাহির মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলো সব সময় বড় হয় না। কখনো কখনো ছোট্ট একটি চরও হাজার প্রাণের আশ্রয় হতে পারে।
আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি নদী,খাল, চর বা জলাভূমিতে কোনো ধরনের ময়লা ফেলব না এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় সচেতন থাকব।
সবুজ তথ্যঃ
নদীর চর ও ছোট দ্বীপগুলো বহু পাখি, মাছ, কচ্ছপ এবং জলজ উদ্ভিদের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এসব এলাকা প্রাকৃতিকভাবে নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে সাহায্য করে এবং অনেক পরিযায়ী পাখির অস্থায়ী আশ্রয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
বন্ধুরা,আগামীকাল পর্ব-৩০ 'সবুজ প্রতিজ্ঞার দিন'
এখানে রাহি,অরণ,শিসু ও বটদাদুর নেতৃত্বে গ্রামের শিশুদের নিয়ে একটি 'সবুজ উৎসব' হবে।