সোমবার, মে ২৫, ২০২৬

ছোট গল্প: শ্রাবণের শেষ বিকেল

  • সৈয়দ জাহিদ সরোয়ার
  • ২০২৫-০৮-০৫ ০২:৪২:৩৯

সন্ধ্যার ধুলোবালিতে খুলনার নিরালা এলাকার পুরনো এক লাইব্রেরি। দেয়ালের রঙ খসে পড়েছে, জানালার গায়ে ধুলোমাখা কাঁচ, বইয়ের তাকগুলো থেমে থাকা সময়ের মতন-পুরনো, কিন্তু গল্পভরা।
এই লাইব্রেরির এক কোণে, জানালার পাশে বসে থাকে তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী নিশি। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়েই আসে, নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে, নির্দিষ্ট বই হাতে।
কিন্তু সে জানে না-লাইব্রেরির অন্য প্রান্তে বসে থাকে একজন-তুহিন। প্রতিদিন ঠিক একঘণ্টা আগে এসে তার অপেক্ষায় থাকে। শুধু তাকানো, দেখা, নীরব ভালোবাসা।
তুহিন কিছু বলতে পারে না। নিশির প্রতি তার ভালোবাসা মুখের ভাষা খোঁজে না।তার প্রেম মানে-একই পৃষ্ঠায় চোখ রাখা, নিশির পাতায় আঙুল রেখে চুপিচুপি হাসা, আর প্রতি শুক্রবারে নিশির জন্য বইয়ের মাঝে গোলাপ রেখে চলে যাওয়া।
তুহিনের ভাবনা-"ভালোবাসা বলতে শুধু বলা নয়,ভালোবাসা মানে কারো মুখে কিছু না শুনেও তার হৃদয়ের শব্দগুলো বুঝে ফেলা।
তুমি যদি চুপ করেও থাকো,
তবুও আমি শুনে যাবো-তোমার নিঃশব্দ প্রেমের কবিতা..."
নিশিও বোঝে, জানে কেউ একজন তার প্রতিদিন বইয়ের ফাঁকে রেখে যায় কবিতার কাগজ, রেখে যায় নীরব অনুভব।
প্রথম প্রথম সে অবহেলা করেছিল, ভেবেছিল নিছক কৌতুক।
কিন্তু চতুর্থ শুক্রবারে যখন বইয়ের পাতার ভাঁজে লেখা ছিল-
“যদি একদিন তুমি চুপ করে থাকো,
আমি বাকি পৃথিবীটাকে নিঃশব্দ করে দেবো,
যাতে শুধু তোমার নীরবতা শুনতে পাই।”
সেদিন, নিশির চোখ কেঁপে উঠেছিল।
সে জানত না, কার লেখা-তবু কেন জানি ভিতরটা থমকে গিয়েছিল।
প্রেম কি এমন হয়?
যেখানে কোনো স্পর্শ নেই, দাবি নেই, নেই কোনও প্রতিশ্রুতির বায়না-
তবু একটা চোখের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকে নিয়ে মন গলে যায়?
তুহিনের কাছে নিশি কোনো দূর গ্রহের আলো। সে তাকে ছুঁতে চায় না-
সে শুধু চায়, নিশির সকাল ভালো কাটুক। নিশির বই হাতে যেন মৃদু হাসি খেলে যাক।
আর নিশি যেন কোনোদিন জানতেই না পারে-তার পেছনে একজন আকাশ হয়ে আছে।
তুহিন প্রেম শেখেনি। সে ভালোবাসতে শিখেছে শুধু তাকিয়ে থেকে।
ভালোবাসা মানে কারো পেছনে হাঁটা নয়, বরং তার পাশে চুপ করে হেঁটে যাওয়া-
না বলেও বোঝাতে চাওয়া-"তুমি থাকলেই আমি পরিপূর্ণ।"
একদিন, লাইব্রেরি বন্ধ ছিল।
তুহিনের মনে হলো, বুকের ভেতরে হালকা বাতাস জমেছে। নিশি আসবে না জানত, তবু সে দাঁড়িয়ে রইল গেটের বাইরে।
হয়তো সে চেয়েছিল, যদি হঠাৎ দেখা হয়ে যায়...
ঠিক তখনই পেছন থেকে এক মিষ্টি কণ্ঠস্বর-
“তুমি কি আজও গোলাপ রেখে গেলে?”
তুহিন চমকে তাকায়।
নিশি। হাতে ছাতা, চোখে প্রশ্ন।
তুহিন মাথা নিচু করে বলে,
“আমি তো আসি বই পড়তে।”
নিশি মৃদু হেসে বলে,
“তুমি যে বই পড়ো, সেগুলো সব আমার পছন্দের।”
তুহিন কিছু বলতে চায়, বলতে চায় হাজারটা কথা-
কিন্তু তুহিন কিছু বলতে পারছিল না।
প্রেমের আসল ভাষা তো চুপ করে বোঝানো।
নিশি এবার ধীরে বলে,
তুমি যদি চুপ করে থাকতে চাও, থাকো।
কিন্তু আমি বুঝি।

প্রতিটি চুপ থাকা, প্রতিটি গোলাপ, প্রতিটি কবিতা… আমার জন্যই ছিল।”
তুহিন শুধু বলে-আমার বলার কিছুই নেই,
কারণ, ভালোবাসা কখনো জোর করে হয় না-
এটা তো সেই ফুল,
যেটা নিজে থেকেই ফোটে… নিঃশব্দে।”
সেদিন হঠাৎ বাতাসে হালকা বৃষ্টি নামে।
নিশির ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে তুহিন চুপ করে থাকে।
সেই নীরবতা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র মুহূর্ত-
যেখানে কেউ কাউকে ছুঁয়েও ছোঁয় না,
কারণ ভালোবাসা মানেই নিজের অনুভূতির ভার অন্য কাউকে বুঝিয়ে দেওয়া নয়,
বরং কাউকে স্পর্শ না করেও ভালোবাসতে পারার নামই সত্য প্রেম।
হঠাৎ করেই তুহিন বলে ওঠে-
"চাইলে তুমি মেঘই হবো নীল আকাশের তলে
ভিজবে না হয় দারুন সুখে বৃষ্টি শীতল জলে।"
নিশির ঠোঁটে একটুখানি হাসি খেলে গেল। সে জানে, তুহিন কবিতা লেখে। তবে আজকের এই কবিতাটা যেন অন্যরকম। নিশি মন দিয়ে বারবার অনুভব করতে লাগল পুরোটা –
তুহিন আবারও বলে ওঠে-
"কানে তোমার পরো যদি হতে পারি দুল
গলায় যদি রাখো তবে হবো মুক্তাফুল
বললে তুমি জরির শাড়ি হবো রাঙা গায়
শাড়ি পরে চলবে তুমি নিঝুম জোছনায়"
নিশি অনুভব করে-এইসব পঙ্‌ক্তি যেন তাকে কেন্দ্র করেই লেখা, যেন প্রতিটি শব্দে তুহিন তার প্রতি নিজেকে নিবেদন করছে।
এভাবেই একটা বছর কেটে যায়।
বছরখানেক পর-
তাদের একসাথে দেখা যায় পুরনো সেই লাইব্রেরিতে।
তুহিন নিশির জন্য বই খুঁজে দেয়।
নিশি প্রতিবার পড়ার সময় তার পাশে এক কাপ চা রেখে দেয়।
তাদের প্রেম আজও নীরব, স্পর্শহীন-
কিন্তু এতটাই গভীর যে, কেউ পাশে থাকলে বুঝতে পারে-
দুটি হৃদয়ের মাঝে এক অদৃশ্য বন্ধন রয়েছে,
যা কারও চোখে পড়ার নয়, কেবল অনুভব করার।
নিশি এখন বুঝতে পারে-অনুভব করতে পারে-
"ভালোবাসা বলতে শুধু বলা নয়,
ভালোবাসা মানে কারো মুখে কিছু না শুনেও তার হৃদয়ের শব্দগুলো বুঝে ফেলা।
তুমি যদি চুপ করেও থাকো,
তবুও আমি শুনে যাবো-তোমার নিঃশব্দ প্রেমের কবিতা..."


এ জাতীয় আরো খবর