আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের তিন বছর পরও মেয়েদের জন্য সাধারণ শিক্ষার দরজা বন্ধ। কাবুলের এক কোণে মুখ ঢাকা এক কিশোরী ভয়ে জড়ানো কণ্ঠে বলল, "আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তালেবান আসার পর সব স্কুল বন্ধ হয়ে গেল।" সহপাঠী সাথে সাথে তাকে চুপ করায়—কারণ এই শাসনের সমালোচনা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তান বিশ্বের একমাত্র দেশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা নিষিদ্ধ। বর্তমানে তাদের জন্য একমাত্র অনুমোদিত শিক্ষা হলো ধর্মীয় মাদ্রাসা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছরে ২২ হাজার ৯৭২টি রাষ্ট্র অনুমোদিত মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছে তালেবান। এসব মাদ্রাসায় কেবল কোরআন, হাদিস ও ইসলামি আইন পড়ানো হয়।
নাজি-এ-বসরা নামের এক বেসরকারি মাদ্রাসায় যদিও বিজ্ঞান ও ভাষার সামান্য শিক্ষা দেওয়া হয়, সরকারি মাদ্রাসাগুলোতে সেটির সুযোগ নেই। ২০২২ সালে তালেবানের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, "মেয়েরা হিজাব পরে না, তারা যেন বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছে। কৃষি বা প্রকৌশল পড়া ইসলাম ও আফগান সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নয়।"
ইউনেসকোর তথ্যমতে, ২০২১ সালের পর থেকে প্রায় ১৫ লাখ মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ হারিয়েছে।
সব নিষেধাজ্ঞার মাঝেও কিছু সাহসী নারী এগিয়ে এসেছেন। কাবুলের ২৩ বছর বয়সী নারগিস একসময় অর্থনীতি পড়তেন, ইংরেজি শিখতেন এবং পার্টটাইম চাকরি করতেন। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরি দুটোই বন্ধ হয়ে যায়। তবু তিনি হার মানেননি।
নিজের বাড়িতেই ছোট বোনদের পড়ানো শুরু করেন। ধীরে ধীরে প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের মেয়েরাও যোগ দেয়। এখন প্রতিদিন সকাল ৬টায় ১২ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ৪৫ জন মেয়ে চুপিচুপি তাঁর বাড়িতে এসে পড়াশোনা করে।
তবে এই সাহসের জন্য নারগিসকে ভয়াবহ ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। দুই মাস আগে তালেবান তাঁর বাড়িতে হানা দেয়, এক রাত তাঁকে হাজতেও কাটাতে হয়। পরিবার থামাতে চাইলেও তিনি স্থান বদলে আবারও গোপন স্কুল চালু করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস-এইড একসময় আফগানিস্তানে গোপন বিদ্যালয় ও অনলাইন স্কলারশিপ চালু করেছিল। কিন্তু অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নারগিস নিজেও এমন একটি স্কলারশিপে পড়াশোনা করছিলেন।
হতাশ কণ্ঠে তিনি বলেন, "আমার মা কোনো দিন স্কুলে যাননি। আমিও আজ ঘরে বন্দী। তাহলে আমরা এত পড়ালেখা করছি কিসের জন্য? কী ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে?"
তালেবান দাবি করে, তাদের মাদ্রাসার শিক্ষা মেয়েদের ‘মায়ের ভূমিকার’ জন্য প্রস্তুত করছে। কিন্তু নারগিস ও তাঁর মতো মেয়েরা বলেন, এই শিক্ষা নয়, তারা চান এমন শিক্ষা যা ভবিষ্যৎ গড়ে। তাঁদের মতে, মাদ্রাসা শিক্ষার নামে চলছে এক নিষ্ঠুর স্বপ্নহত্যা।
কীওয়ার্ডস: আফগানিস্তান নারীদের শিক্ষা সংকট, তালেবান মাদ্রাসা শিক্ষা, গোপন স্কুল নারগিস কাবুল, আফগান মেয়েদের মানবাধিকার, তালেবান শাসনে নারী অধিকার হুমকিতে