গাজা উপত্যকায় টানা কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর নতুন করে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস জানিয়েছে, তারা মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক কিছু প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে, তবে তাদের অবস্থান একটাই-এটি হতে হবে একটি স্থায়ী যুদ্ধাবসানের রূপরেখা।
বুধবার (২ জুলাই) রাতে এক বিবৃতিতে হামাস জানায়, তারা একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে কাজ করছে, যাতে গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার হয় এবং অবরুদ্ধ অঞ্চলটির জনগণ শান্তিপূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।
এই প্রস্তাব আসে এমন এক সময়, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন একটি ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে বন্দিমুক্তি, মানবিক সহায়তা এবং যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের পথে সমঝোতা সম্ভব। ট্রাম্প হামাসকে এই প্রস্তাবে রাজি হওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, “পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগে শান্তির জন্য পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”
তবে হামাসের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তারা কেবল একটি সাময়িক বিরতির পরিবর্তে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি নিশ্চিত করতে চায়। এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা আর কোন সাময়িক সমাধানে আগ্রহী নই, যা একেক সময় ইসরাইলের সুবিধামতো ভেঙে ফেলা হয়। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য-গাজার ওপর চালানো আগ্রাসনের অবসান।”
হামাসের বিবৃতির কিছুক্ষণের মধ্যেই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সামাজিক মাধ্যমে জানান, “যুদ্ধ-পরবর্তী গাজায় হামাসের কোনো স্থান থাকবে না।” এই বক্তব্য নতুন করে সংশয় তৈরি করেছে যে, আদৌ দুই পক্ষ কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে কি না।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন-যদি সমঝোতার অগ্রগতি না হয়, তাহলে গাজার মধ্যাঞ্চল, বিশেষ করে গাজা সিটি ও শরণার্থী শিবিরগুলোতে রাফার মতোই হামলা জোরদার করা হবে।
এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যা করেছি রাফায়, সেটিই হবে কেন্দ্রীয় গাজাতেও। আমাদের লক্ষ্য হামাসকে সামরিকভাবে পরাস্ত করা। যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অগ্রগতি না হলে আমরা আর বিকল্প দেখছি না।”
যদিও মার্কিন প্রস্তাবে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সার সমর্থন দিয়েছেন, তবে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেনগাভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এখনো প্রকাশ্যে প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেননি। ফলে নেতানিয়াহু সরকার অভ্যন্তরীণ চাপেও রয়েছে।
গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ জানান, যুদ্ধবিরতির কথা শোনার পরেও ফিলিস্তিনিরা খুব একটা আশাবাদী নন। তিনি বলেন, “শিরোনামে যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও বাস্তবে গাজায় প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১২০ জন নিহত হচ্ছেন। এখানকার মানুষ বারবার প্রতারিত হয়েছে, তাই নতুন প্রস্তাবেও তাদের আস্থা নেই।”
তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধবিরতির পরিবেশ তৈরি না করে যদি ঘোষণা দেওয়া হয়, তবে সেটা ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছু নয়।”
গাজায় ইতোমধ্যে চিকিৎসা, খাদ্য ও নিরাপদ পানির অভাবে দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ থামানো না হলে গাজায় একটি মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠবে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-হামাস ও ইসরাইল উভয়পক্ষই যেখানে কৌশলগতভাবে কঠোর অবস্থানে, সেখানে মধ্যস্থতাকারীদের প্রস্তাব কার্যকর হতে পারবে কি? বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা যতই থাকুক, হামাস এবং ইসরাইলের মধ্যে আস্থার সংকট এবং রাজনৈতিক বিভাজন একটি কার্যকর শান্তিচুক্তিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলছে।
সূত্র: আল জাজিরা, অ্যাক্সিওস, হামাস বিবৃতি, ইসরাইলি সরকারি বার্তা