ঢাকা| ৪ জুন ২০২৫
সাবেক তেল-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এক নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। দেশটির নাগরিকরা এখন আর শুধু বিটকয়েন বা ইথেরিয়ামের নাম জানেন না-তারা মুদি কেনা, ট্রাফিক জরিমানা কিংবা সরকারি সেবা নিতেও ব্যবহার করছেন ক্রিপ্টোকারেন্সি।
সাম্প্রতিক এক সরকারি উদ্যোগে দুবাই সরকারের বিভিন্ন পরিষেবার মূল্য এখন ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পরিশোধযোগ্য হয়েছে। এ উপলক্ষে দুবাইয়ের অর্থ বিভাগ ও আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ‘ক্রিপ্টো ডটকম’-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এই পদক্ষেপ শুধু একটি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়-এটি মধ্যপ্রাচ্যের হৃদয়ে ক্রিপ্টো-ভিত্তিক অর্থনীতির সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি।
বিট ওয়েসিস-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ওলা দাউদিন বলেন, "ক্রিপ্টো যখন সরকারি সেবার অর্থপ্রদানে ব্যবহারযোগ্য হয়, তখন এটি আর নিছক কোনো ডিজিটাল বিনিয়োগ নয়-এটি হয়ে দাঁড়ায় বাস্তব জীবনের সমাধান।"
তিনি উল্লেখ করেন, স্টেবলকয়েন ইতোমধ্যেই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিগ্রস্ত দেশগুলোতে সম্পদের মূল্য ধরে রাখার উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে সস্তা ও দ্রুত রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তি কার্যকর।
ইতোমধ্যে দেশটির বেশ কিছু রিয়েল এস্টেট কোম্পানি, এয়ারলাইনস, ফুয়েল স্টেশন ও রেস্টুরেন্ট বিটকয়েন, ইথেরিয়ামের মতো মুদ্রা গ্রহণ করছে। এমনকি দুবাইয়ের একটি আদালত সম্প্রতি রায় দিয়েছে, যেখানে একজন কর্মীকে তার চুক্তি অনুযায়ী আংশিক বেতন ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইসিএম-এর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক সাই মাহেশ বলেন, "দুবাইয়ের সুসংগঠিত আর্থিক কাঠামো, স্বচ্ছ নীতিমালা এবং একাধিক লাইসেন্সপ্রাপ্ত এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম-এই তিনটি বিষয়ই ক্রিপ্টোর গণগ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করছে।"
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা এখন আর ভবিষ্যতের কল্পনা নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতা।
দাউদিন বলেন, “আমরা এখন এক ধাপে ধাপে বিস্তারের ধারায় রয়েছি-প্রথমে সরকারি পরিষেবা, এরপর বিলাসবহুল খাত (হোটেল, ফ্যাশন, বিমান), তারপর আসবে দৈনন্দিন কেনাকাটা, ইউটিলিটি বিল ও শেষ পর্যন্ত বেতন।”
ক্রিপ্টো বিস্তারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে ইউএই-এর তরুণ প্রজন্ম। প্রযুক্তি সচেতন, ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক এবং গ্লোবাল ট্রেন্ডে যুক্ত থাকতে চাওয়া এই প্রজন্মই প্রথম হাত বাড়াচ্ছে ডিজিটাল মুদ্রার দিকে।
একটি সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, দুবাইয়ের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নাগরিকদের মধ্যে ৬৫ শতাংশের বেশি কোনো না কোনো ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ অ্যাকাউন্ট খুলেছেন বা রাখার পরিকল্পনায় আছেন।
ক্রিপ্টো ব্যবহারের বিস্তার যেমন ইতিবাচক, তেমনি এতে নিরাপত্তা ও জালিয়াতি সংক্রান্ত শঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। এ জন্য দুবাই সরকার প্রতিটি এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্মের জন্য লাইসেন্স ও নিয়মিত অডিট বাধ্যতামূলক করেছে।
এছাড়া, মুদ্রা লেনদেন, সাইবার ঝুঁকি এবং আর্থিক জালিয়াতি রোধে নির্ধারিত নিরাপত্তা নীতিমালা তৈরি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দুবাই এখন বিশ্বের সেই বিরল শহরগুলোর একটি, যারা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মূলধারায় নিয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর জন্য এই মডেল হতে পারে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা।
ক্রিপ্টো আর শুধু উচ্চবিত্ত বিনিয়োগকারীর খেলা নয়। এটি এখন সাধারণ নাগরিকের পকেটে থাকা ওয়ালেট, বাজারের মুদি দোকানদার, কিংবা সরকারি অফিসে বিল প্রদানকারী এক কর্মীর প্রাত্যহিক বাস্তবতা।
যদি বর্তমান প্রবণতা বজায় থাকে, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ইউএই হতে পারে বিশ্বের প্রথম ‘ক্রিপ্টো-সহনশীল’ রাষ্ট্র, যেখানে ব্যাংকের মতোই সম্মান পাবে ডিজিটাল ওয়ালেট।
সূত্র: খালিজ টাইমস, দুবাই ফিনান্সিয়াল ডিপার্টমেন্ট, ক্রিপ্টো ডটকম