ঢাকা | ৪ জুন ২০২৫
ইসরাইলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ফের একবার ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, আর কোনো মসজিদে মাইকে আজান দেওয়া যাবে না। এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি হিসেবে তিনি আজানকে ‘শব্দদূষণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ নির্দেশনায় পুলিশ প্রশাসনকে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মসজিদে প্রবেশ করে লাউডস্পিকার জব্দ করাসহ জরিমানা আরোপ।
এই পদক্ষেপ শুধু ইসরাইলের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এই সিদ্ধান্তকে ‘ধর্মীয় আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে-এটি মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি এক গভীর অবমাননা।
রোববার ইসরাইলের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশটির জেলা পুলিশ কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে বেন-গাভির বলেন, “আমি তোমাদের নিয়োগ দিয়েছি আমার নীতি বাস্তবায়নের জন্য।” তাঁর এমন বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, এটি শুধুই ‘আইনি নির্দেশ’ নয়-বরং এটি একটি রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নের কৌশল।
বলা হচ্ছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রথম ঘোষণা দেন বেন-গাভির। তখন থেকেই পুলিশের হাতে মসজিদের লাউডস্পিকার জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়, এমনকি আজান প্রচার করলেই জারি করা হয় অর্থদণ্ড। এখন সেই নীতিকে আরও কঠোর করে বাস্তবায়ন করতে মাঠে নেমেছে পুলিশ প্রশাসন।
বেন-গাভির আজানকে সরাসরি শব্দদূষণ বলে আখ্যা দিয়ে বিষয়টিকে একটি পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এখানে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই বড় ভূমিকা রাখছে।
বিশেষ করে আরব ও মিশ্র জনগোষ্ঠীর বসবাস যেখানে বেশি, সেই সব এলাকায় আজানের শব্দ বন্ধ করার মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে বলেই মনে করছেন অনেকেই। কারণ ইসরাইলে শব্দদূষণ বিরোধী আইন থাকলেও, মসজিদের লাউডস্পিকার নিষিদ্ধের ক্ষেত্রে এমন নির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ আগে কখনো নেওয়া হয়নি।
এমন সিদ্ধান্তের পর দেশটির অভ্যন্তরেও দেখা দিয়েছে মতপার্থক্য। কয়েকজন জেলা পুলিশ কর্মকর্তা ইতিমধ্যেই সতর্ক করে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ এবং ধর্মীয় ইস্যুতে হস্তক্ষেপ আরব ও মিশ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে সামাজিক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কিন্তু বেন-গাভির এসব বার্তা আমলে না নিয়ে বরং উল্টো অভিযোগ করেছেন যে, অনেক পুলিশ কর্মকর্তাই তাঁর নির্দেশনা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছেন না। তিনি বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন কেন্দ্রীয় জেলার পুলিশ প্রধানকে, যিনি ইতোমধ্যে কয়েকটি মসজিদের বিরুদ্ধে ‘ভারী জরিমানা’ আরোপ করেছেন।
ইসরাইলি সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে হামাস। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, “আজান নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকারের ওপর প্রকাশ্য আগ্রাসন। এটি ইসরাইলি রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত ধর্মীয় নিপীড়নের অংশ।”
হামাস আরও সতর্ক করে বলেছে, এমন দমন-পীড়ন কেবল ফিলিস্তিনিদের নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বের মধ্যেই ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে। তাঁদের মতে, ইসরাইল সরকার বর্তমানে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আঘাত হেনে একটি ভয়ানক উত্তেজনা তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
এই ইস্যুতে এখন পর্যন্ত বড় কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না দিলেও, বিশ্লেষকরা মনে করছেন-মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিমপ্রধান দেশগুলো এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে পারে। ইউরোপ ও আমেরিকায় মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে, কারণ ধর্মীয় স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের একটি অন্যতম মৌলিক অধিকার।
ইসরাইলি রাজনীতিতে বেন-গাভির একজন চরম ডানপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত। অতীতে আরব ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে তিনি বহুবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন। তাঁর এই আজানবিরোধী অবস্থান সেই ধারারই সর্বশেষ সংযোজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেন-গাভিরের এমন সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত আদর্শ নয়, বরং এটি ইসরাইলের বর্তমান সরকারের ধর্মীয় নীতির প্রতিফলন, যা ক্রমেই বেশি জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় বিভাজনমুখী হয়ে উঠছে।
মুসলিমদের জন্য আজান শুধু ডাক নয়, বরং এটি ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক সংহতির প্রতীক। সেই প্রতীকে হস্তক্ষেপ করাকে অনেকেই মুসলিম পরিচয়ের বিরুদ্ধে একটি আঘাত হিসেবে দেখছেন। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া আসার আশঙ্কা প্রবল। বিশেষ করে যখন এই সিদ্ধান্ত এমন একজন নেতার কাছ থেকে আসছে, যিনি এর আগেও ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন।
ইসরাইলে আজান নিষিদ্ধের এই পদক্ষেপ একটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত হলেও এর অভিঘাত কেবল সীমান্তে আটকে থাকবে না। এটি বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজে আলোড়ন তুলতে পারে। ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে যে রাজনীতি চলছে, সেটি একদিকে জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিচ্ছে, অন্যদিকে ধর্মীয় সহাবস্থানের ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয় কিংবা আন্তর্জাতিক চাপ কতটুকু ভূমিকা রাখে-তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, আজানের সেই পবিত্র ধ্বনিকে "শব্দদূষণ" বলার সাহসী দাবি কেবল রাজনীতি নয়, বরং ইতিহাসের এক বিভাজন রেখার সাক্ষী হয়ে থাকবে।