গাজা উপত্যকায় নতুন করে সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আহত রিজার্ভ সেনাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, “অপারেশন চূড়ান্ত পর্যায়ে, আমরা হামাসকে ধ্বংস করব-এবার পুরোপুরি।”
সোমবার রাতে এই মন্তব্যের পর মঙ্গলবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এক বিবৃতিতে জানান, গাজায় সামরিক তৎপরতা ‘খুব শিগগিরই’ পূর্ণমাত্রায় শুরু হবে। নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন, এই যুদ্ধ কোনো আপোষ বা অর্ধেক পথে থেমে যাবে না-সাময়িক যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা থাকলেও, চূড়ান্ত লক্ষ্য পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়া হবে।
গত বছরের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের পর একাধিক যুদ্ধবিরতি হলেও, চলতি বছরের ১৮ মার্চ থেকে ইসরাইল ফের নতুন সামরিক তৎপরতা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ইসরাইল সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজা অভিযানের সম্প্রসারণ অনুমোদন করে, যার মধ্যে রয়েছে গাজায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির প্রস্তুতিও।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আসন্ন এই অভিযানটি হবে ব্যাপকতর, এবং তার অংশ হিসেবে গাজার বেশিরভাগ বাসিন্দাকে স্থানচ্যুত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নেতানিয়াহুর ঘোষণার মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো গাজার ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছা স্থানান্তর’ কর্মসূচির ধারণা। ইসরাইলি নিরাপত্তা মহল জানিয়েছে, গাজাবাসীদের মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে স্থানান্তরিত করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
এই পরিকল্পনার পেছনে আছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত একটি বিতর্কিত ধারণা, যেখানে গাজাবাসীদের মিশর বা জর্ডানে পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু এ ধারণা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে মিশর, জর্ডান, ফিলিস্তিন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এটিকে যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য বলছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে গাজার প্রায় ২৪ লাখ বাসিন্দা অন্তত একবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সামরিক অভিযান মানে আরও রক্তপাত, ধ্বংস এবং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়।
নেতানিয়াহুর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরাইল এমন দেশ খুঁজছে যারা গাজার বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় দিতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি ‘বাধ্যতামূলক নির্বাসন’ হিসেবে বিবেচিত হলে তা যুদ্ধাপরাধের আওতায় পড়বে বলে সতর্ক করেছে অনেক মানবাধিকার সংগঠন।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণা ইসরাইলের রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাপ, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং অস্ত্রবিরতির সম্ভাবনার মাঝেও নেতানিয়াহু সরকার একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পথে হাঁটছে। এটি শুধু হামাস নয়, গাজার জনগণকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।
নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে। যেখানে বিশ্ব সম্প্রদায় গাজায় যুদ্ধবিরতি ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে, সেখানে ইসরাইলের পক্ষ থেকে আসছে ‘চূড়ান্ত আঘাতের প্রস্তুতি’র বার্তা। এই সংঘাতের শেষ কোথায়-তা এখনও অজানা, কিন্তু প্রতিটি দিন গাজাবাসীর জন্য বয়ে আনছে নতুন দুঃস্বপ্ন।