সোমবার, অক্টোবর ১২, ২০২৬

রূপপুরে পারমাণবিক বিক্রিয়ার পথে অগ্রগতি,গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার অপেক্ষা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-১০-১১ ১০:১৫:০০
ফাইল ছবি

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালুর প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষার ফল অনুমোদিত হওয়ায় চুল্লি চালুর পরবর্তী কারিগরি কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই শেষ হলে আগামী মাসে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি আগে থেকেই চলছিল। তবে নিরাপত্তা ভালভের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ায় নির্ধারিত কার্যক্রমে বিলম্ব হয়। পরে উচ্চ চাপে দুই দফা পরীক্ষা সম্পন্ন করে ফলাফল নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার পরীক্ষার ফল অনুমোদন পাওয়ার পর পরবর্তী ধাপের কাজ এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
ধাপে ধাপে চালুর প্রক্রিয়া
রূপপুরের প্রথম ইউনিট চালুর ক্ষেত্রে এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হলো চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বনির্ভর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠা, যা কারিগরি পরিভাষায় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ নামে পরিচিত। এ ধাপ সম্পন্ন হলেই সরাসরি পূর্ণমাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে না। এরপর চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, ধারাবাহিক কারিগরি পরীক্ষা এবং তাপ উৎপাদনক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানোর কাজ চলবে।
পরবর্তী পর্যায়ে উৎপন্ন বাষ্পের সাহায্যে টারবাইন ঘোরানো এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনার কথা প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে প্রকৃত সময়সূচি নির্ভর করবে নিরাপত্তা যাচাই ও কারিগরি প্রস্তুতির অগ্রগতির ওপর।
জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। উভয় ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এই বিদ্যুৎ দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করতে পারে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
রাশিয়ার কারিগরি সহায়তায় নির্মিত এ কেন্দ্রের চুল্লিতে ব্যবহার করা হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি। এতে ইউরেনিয়ামের পরমাণু বিভাজনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হয়। সেই তাপে পানি থেকে তৈরি বাষ্প টারবাইন ঘোরায় এবং জেনারেটরের সাহায্যে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। কয়লা, তেল বা গ্যাস পুড়িয়ে সরাসরি তাপ তৈরির প্রয়োজন না হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ তৈরি হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে সম্ভাবনা
রূপপুরের দুটি ইউনিট চালু হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্পকারখানার উৎপাদন, নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে কেন্দ্রের নিয়মিত উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সক্ষমতার ওপর।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পারমাণবিক শক্তি উইংয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, রূপপুর কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়; এটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষ জনবল তৈরিরও বড় সুযোগ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিট উৎপাদনের প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়ামও প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে।
একই উইংয়ের অতিরিক্ত সচিবের মতে, কেন্দ্রটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেনও রূপপুরকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দীর্ঘ প্রস্তুতির পর বাস্তব উৎপাদনের অপেক্ষা
রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা স্বাধীনতার পরপরই আলোচনায় আসে। ১৯৭৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান সফরাটমের মাধ্যমে ১২৫ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও সে উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমীক্ষা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে পরিকল্পনাটি এগোয়। পরে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে বর্তমান প্রকল্পের কাঠামো নির্ধারিত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে কমিশনিং কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে।
পরিকল্পিতভাবে কেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। প্রয়োজনীয় কারিগরি সংস্কার ও নিরাপত্তা মূল্যায়নের পর নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে তা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নির্ধারিত বিরতিতে জ্বালানি পরিবর্তন এবং কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষা অপরিহার্য।
এখন রূপপুরের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো নির্ধারিত নিরাপত্তামান বজায় রেখে প্রতিটি কারিগরি ধাপ সম্পন্ন করা। পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে বাণিজ্যিক পরিচালনায় পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সফল হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় নতুন একটি অধ্যায় শুরু হবে।

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিক বিদ্যুৎ, জাতীয় গ্রিড


এ জাতীয় আরো খবর