রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০২৬

খেলাপি ঋণ কমাতে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা বাংলাদেশ ব্যাংকের

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-১০-১০ ০৯:৪১:৫৮

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমানো, ঋণ আদায় বাড়ানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী এক থেকে পাঁচ বছরের এসব উদ্যোগে ঋণ আদায়ে তদারকি জোরদার, নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের উৎসাহ দেওয়া এবং ব্যাংক খাতের আইনি কাঠামো সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী এক বছরের মধ্যে যেসব ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, সেসব ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে প্রতি তিন মাসে আলোচনা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ আদায়ের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হবে। পাশাপাশি শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অগ্রগতিও নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে।
বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ পুনরুদ্ধার কৌশলবিষয়ক বিশেষ নির্দেশিকা তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হবে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান অনুসারে সম্ভাব্য ঋণক্ষতি নিরূপণ ও সংস্থান সংরক্ষণের ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের তালিকা প্রকাশের আইনি দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী দুই থেকে তিন বছরে খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রণোদনা দেওয়ার নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ রয়েছে। নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের উৎসাহিত করতে বিদ্যমান নীতিমালাও পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ঋণ অনুমোদন, তদারকি, আদায় ও শ্রেণিকরণের প্রতিটি পর্যায়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণ খেলাপি হওয়ার পর আদায়ের তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি শুরু থেকেই ঋণঝুঁকি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। গত ৩১ মার্চ এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কয়েকটি আইন সংস্কারের কাজও চলছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া। সংশোধিত খসড়াটি গত ২৪ আগস্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
এ ছাড়া ঋণ আদায় প্রক্রিয়া কার্যকর করতে অর্থঋণ আদালত (সংশোধন) আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন এবং বিদ্যমান দেউলিয়াত্ব আইন আধুনিকায়ন করে নতুন আইন প্রণয়নের কাজও চলছে। নতুন দেউলিয়াত্ব আইনের ইংরেজি খসড়া আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থার সহায়তায় প্রস্তুত করা হয়েছে। সেটি বাংলায় অনুবাদের জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেমের মতে, ব্যাংক খাতে ঋণ আদায়ে ছাড় দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা এবং খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করা জরুরি। ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা-উভয় পক্ষকে কার্যকর সমাধানের দিকে উৎসাহিত করতে উপযুক্ত প্রণোদনা তৈরির ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ঋণ আদায়ে তদারকি বাড়ানো, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি আইনি সংস্কার ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ব্যাংক খাতের সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারে সহায়ক হতে পারে।

খেলাপি ঋণ, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক সংস্কার


এ জাতীয় আরো খবর