বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬

একের পর এক সহিংস ঘটনায় মহেশখালীতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ,চোর সন্দেহে পি*টি*য়ে হ*ত্যা,

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৯-১৫ ২০:০১:৩৮

 গৃহবধূকে ছুরিকাঘাতে হত্যা প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনের ভূমিকা!
মহেশখালী (কক্সবাজার) 

দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে একের পর এক সহিংস ও  প্রাণঘাতী  ঘটনায়  জনমনে  উদ্বেগ  বাড়ছে।  গত কয়েক  দিনের   ব্যবধানে   মাতারবাড়ী   বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকায়  এক  যুবকের   মরদেহ   উদ্ধার, হোয়ানকে গৃহবধূকে    ছুরিকাঘাতে   হত্যা   এবং   সর্বশেষ  বড় মহেশখালীতে চোর  সন্দেহে  এক যুবককে  বৈদ্যুতিক খুঁটির   সঙ্গে   বেঁধে   পিটিয়ে  হত্যার   অভিযোগ সব মিলিয়ে   উপজেলার   আইনশৃঙ্খলা  পরিস্থিতি নিয়ে 
নতুন   করে  প্রশ্ন   উঠেছে।   সর্বশেষ   মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে বড় মহেশখালীর পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকায়   মো. ফয়সাল  (২৬)  নামের   এক যুবককে বৈদ্যুতিক  খুঁটির  সঙ্গে  বেঁধে ইট দিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। 
স্থানীয়   সূত্রের   বরাতে   প্রকাশিত   প্রতিবেদনে  বলা হয়েছে, আগের রাত থেকে তাকে চোর সন্দেহে আটকে রেখে  মারধর  করা হয়   এবং   সকালে   কয়েক দফা পেটানোর  পর  তার  মৃত্যু হয়।   এ ঘটনায়  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার কথাও প্রতিবেদনে  উল্লেখ  করা হয়েছে। ঘটনাটি বিশেষভাবে মর্মান্তিক  হয়ে  উঠেছে  নিহতের  পারিবারিক অবস্থার কারণে।  স্থানীয়  সূত্রের  বরাতে  জানা গেছে, নিহতের ছোট   সন্তান   রয়েছে   এবং    তাঁর  স্ত্রী  আট  মাসের অন্তঃসত্ত্বা।  একজন মানুষের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ থাকলেও  তাকে   আটক, বিচার   ও  শাস্তি   দেওয়ার এখতিয়ার  কোনো  ব্যক্তি  বা গোষ্ঠীর নেই। অভিযোগ সত্য   হলেও  আইন  নিজের  হাতে তুলে নিয়ে মারধর করে কাউকে  হত্যা  করা  আইনের শাসনের পরিপন্থী।
প্রকাশিত  প্রতিবেদনে  স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্যও এসেছে।   সংশ্লিষ্ট   ইউনিয়ন  চেয়ারম্যান ঘটনার কথা শুনেছেন বলে জানান এবং পরে হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলেন। তবে ঘটনার বিষয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর   দায়িত্ব   ও   প্রতিক্রিয়া   জানতে  চাইলে   তিনি বিস্তারিত বলতে চাননি। 
একই ঘটনায় মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুস  সুলতানের  সঙ্গে  মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাতারবাড়ীতেও   রহস্যজনক   মৃত্যু, এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর  মাতারবাড়ী  তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের টাউনশিপ সংলগ্ন একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে মনিরুল ইসলাম (২৮) নামে  এক  যুবকের মরদেহ  উদ্ধার করে পুলিশ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায় তিনি দক্ষিণ রাজঘাট এলাকার বাসিন্দা  এবং  দুই  দিন ধরে  নিখোঁজ ছিলেন। পুলিশ ঘটনাস্থল   থেকে   মরদেহ   উদ্ধার    করে।   নিহতের স্বজনদের   পক্ষ   থেকে   হত্যার  অভিযোগও  তোলা হয়েছে। মহেশখালী থানার ওসি মো. আবদুস সুলতান মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।ঘটনাটিকে ঘিরে  স্থানীয়দের  মধ্যে   ক্ষোভের   সৃষ্টি হয়। তবে ওই যুবকের  মৃত্যুর  প্রকৃত  কারণ  কী  তা তদন্ত ও ময়না তদন্তের  ফলাফলের  ভিত্তিতেই  নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
হোয়ানকে  গৃহবধূ হত্যা, এর  মাত্র এক  দিন আগে, ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মহেশখালীর  হোয়ানক  ইউনিয়নের পদ্মপুকুরপাড় শীলপাড়ায় শিল্পী রানী শীল (৫০) নামে এক গৃহবধূকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাড়িতে  চোর  প্রবেশ  করেছে বুঝতে পেরে তিনি চিৎকার করলে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয় বলে  প্রাথমিকভাবে জানা যায়।  পরে স্বজনেরা উদ্ধার করে হাসপাতালে  নেওয়ার  পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা   করেন।    মাত্র    কয়েক    দিনের   ব্যবধানে
উপজেলার পৃথক এলাকায় একাধিক প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটেছে।   এসব  ঘটনায়   অপরাধের ধরন ভিন্ন হলেও একটি   বিষয়   একই   সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আইন  হাতে তুলে  নেওয়ার  প্রবণতা  কতটা ভয়াবহ?
চোর  সন্দেহে  কাউকে  ধরে মারধর, খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা কিংবা  গণপিটুনি  এসব  ঘটনা শুধু একটি হত্যা কাণ্ডের  মধ্যে  সীমাবদ্ধ  নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আইনের শাসন,নাগরিক নিরাপত্তা এবং পুলিশের প্রতি সাধারণ  মানুষের  আস্থার প্রশ্ন। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেছেন বলে সন্দেহ হলে তাঁকে আটক করে পুলিশের কাছে   হস্তান্তর  করার   আইনগত  পথ  রয়েছে। কিন্তু সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে জনতার হাতে তুলে দিয়ে শারীরিক  নির্যাতন  বা  হত্যার ঘটনা ঘটলে সেটি ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।
প্রশাসনের  দৃশ্যমান  তৎপরতা  নিয়ে  প্রশ্ন, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ প্রশাসন ও পুলিশের আরও দৃশ্যমান তৎপরতা প্রত্যাশা করছেন। বিশেষ করে  রাতের নিরাপত্তা, অপরাধপ্রবণ এলাকায়    টহল    বৃদ্ধি,  সন্দেহভাজন   অপরাধীদের বিরুদ্ধে   আইনগত  ব্যবস্থা  এবং ঘটনার দ্রুত তদন্তের দাবি  উঠছে। স্থানীয়দের  অভিযোগ, সহিংসতার ঘটনা গুলোর পর রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের  পক্ষ  থেকে দৃশ্যমানভাবে উদ্বেগ প্রকাশ বা কার্যকর   উদ্যোগ   খুব   বেশি দেখা যাচ্ছে না। তবে এ অভিযোগের   বিষয়ে   সংশ্লিষ্ট   রাজনৈতিক   নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য পাওয়া যায় নি।
ওসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন,সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর মহেশখালী থানার  ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।  বিশেষ করে সাংবাদিক ও সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ,অভিযোগ গ্রহণ, দ্রুত  ঘটনাস্থলে  পুলিশের  উপস্থিতি এবং ঘটনার পর পুলিশের   পদক্ষেপ   কতটা   কার্যকর   এসব  বিষয়ে জবাবদিহিতা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক  নেতৃত্বের  নীরবতা  কতটা  গ্রহণযোগ্য?
মহেশখালীতে  একের  পর  এক সহিংস ঘটনার পর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকেও জননিরাপত্তা নিয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশিত। রাজনৈতিক  মতাদর্শ  ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা  দলীয়  রাজনীতির  ঊর্ধ্বে। একজন নিহত ব্যক্তির  পরিবারে  ছোট সন্তান, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী কিংবা অসহায়  স্বজন  রেখে  যাওয়ার ঘটনা কেবল একটি পরিবারের  ট্র্যাজেডি নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য সতর্কবার্তা।
তদন্ত ও জবাবদিহিতাই এখন প্রধান  দাবি, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত ও  নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা  বের  করা  জরুরি। কে বা  কারা  হামলা করেছে,  কেন  করেছে, আগে  থেকে  কোনো  বিরোধ ছিল কি না, পুলিশকে কখন জানানো হয়েছিল, পুলিশ কত দ্রুত   ঘটনাস্থলে   পৌঁছেছে   এবং  অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে  কী ব্যবস্থা  নেওয়া হয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর জনসম্মুখে আসা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাতারবাড়ীর যুবকের মৃত্যুর কারণ,হোয়ানকের গৃহবধূ হত্যার রহস্য এবং  বড়   মহেশখালীর  ফয়সাল  হত্যার  অভিযোগ প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
মহেশখালীর মানুষ এমন একটি পরিবেশ চায়,যেখানে কোনো  ব্যক্তিকে  চোর  সন্দেহে  জনতা পিটিয়ে হত্যা করতে  পারবে না;  কোনো  নারী নিজ ঘরে  নিরাপত্তা হীনতায়  ভুগবেন না;  আর  কোনো পরিবার প্রিয়জন হারিয়ে  ন্যায়বিচারের  জন্য  দিনের পর দিন অপেক্ষা করবে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত  এবং পুলিশের জবাবদিহিতা নিশ্চিত  করা   এ মুহূর্তে   মহেশখালীর  সবচেয়ে বড় জনদাবিগুলোর একটি।


এ জাতীয় আরো খবর