রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
পর্ব-৭১:
সকালের রোদ তখনও নরম।
বটদাদুর নিচে বসে রাহি আগের দিনের খাতাটা খুলল। গ্রামের মানচিত্রটি তার সামনে মেলে রাখা।
মানচিত্রে নীল রেখায় আঁকা পুরোনো জলপথ,পুকুর,নালা আর গ্রামের সবুজ জায়গাগুলো এখন বেশ স্পষ্ট।
অরণ পাশে বসে বলল,-‘আমাদের মানচিত্র তো তৈরি হয়েছে। এবার কী?’
রাহি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,-‘আমরা গ্রামের পানির পথ খুঁজেছি। এবার গ্রামের গাছগুলোকে খুঁজে দেখি।’
শিসু সঙ্গে সঙ্গে বলল,- ‘গাছ খুঁজব? গাছ তো চোখের সামনেই আছে!’
রাহি হেসে বলল,-‘গাছ দেখা আর গাছকে চেনা এক কথা নয়।’
ঠিক তখনই নাসির স্যার সেখানে এসে দাঁড়ালেন।
-‘রাহি ঠিক বলেছে,’ তিনি বললেন। ‘তোমরা যদি গ্রামের সব বড় গাছের একটি তালিকা তৈরি করো, তাহলে কয়েক বছর পর আবার দেখে বোঝা যাবে-কোন গাছ আছে, কোনটি নেই, নতুন কোন গাছ হয়েছে।’
অরণ খাতা খুলে লিখল-
‘গাছের পরিচয় খাতা।’
শিসু বলল,-‘শুধু গাছের সংখ্যা লিখলেই হবে?’
নাসির স্যার বললেন, ‘না। গাছের নাম, কোথায় আছে, আনুমানিক বয়স, কে দেখাশোনা করে-যতটা সম্ভব এসব তথ্যও লিখবে। আর কোনো তথ্য নিশ্চিত না হলে অনুমান করে লিখবে না।’
তিন বন্ধু কাজে নেমে পড়ল।
প্রথমেই তারা বটদাদুকে তালিকায় রাখল।
তারপর স্কুলের মাঠের কৃষ্ণচূড়া, পুকুরপাড়ের নারকেলগাছ, রাস্তার ধারের নিমগাছ, পুরোনো আমগাছ-একটির পর একটি গাছের তথ্য লিখতে লাগল।
কিছুদূর যাওয়ার পর শিসু হঠাৎ থেমে গেল।
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল একটি কড়ইগাছ।
গাছটির গুঁড়ি এত মোটা যে তিনজন হাত ধরাধরি করেও পুরোটা ঘিরে দাঁড়াতে পারল না।
অরণ বলল,-‘এটা তো আমাদের তালিকায় নেই।’
রাহি গাছটির দিকে তাকিয়ে বলল,-‘কে জানে, এই গাছটি কত পুরোনো!’
তারা পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধের কাছে গেল।
বৃদ্ধ অনেকক্ষণ গাছটির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,-‘এই গাছ আমি ছোটবেলা থেকেই দেখছি। তখন এই রাস্তা এত চওড়া ছিল না। আশপাশে অনেক খালি জায়গা ছিল।’
রাহি জিজ্ঞেস করল, ‘গাছটি কে লাগিয়েছিল, তা কি জানেন?’
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
-‘না। তবে আমার বাবার কাছেও শুনেছি,গাছটি তখনও বড় ছিল।’
অরণ অবাক হয়ে বলল,-‘তাহলে গাছটির বয়স অনেক।’
রাহি খাতায় লিখল-
‘পুরোনো কড়ইগাছ। সঠিক বয়স জানা যায়নি। স্থানীয় প্রবীণদের মতে,বহু বছরের পুরোনো।’
শিসু বলল,-‘আমরা তো গাছ গুনতে বের হয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখি গাছগুলোরও গল্প আছে।’
রাহি মৃদু হেসে বলল,-‘হ্যাঁ। আর কিছু গল্প হয়তো হারিয়ে যাচ্ছে।’
তিনজন আবার হাঁটতে শুরু করল।
দুপুরের আগে তারা পনেরোটি বড় গাছের তথ্য সংগ্রহ করতে পারল।
বটদাদুর নিচে ফিরে এসে রাহি খাতার শেষ পাতায় নতুন একটি তালিকা করল।
‘যেসব গাছের পরিচয় ও ইতিহাস খুঁজে দেখা দরকার।’
অরণ বলল,-‘এই তালিকাটা আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
শিসু মাথা নেড়ে বলল,-‘কারণ গাছগুলো হয়তো থাকবে,কিন্তু তাদের গল্প হারিয়ে যেতে পারে।’
নাসির স্যার কথাটা শুনে বললেন,-‘ঠিক তাই। কোনো কিছু রক্ষা করতে হলে আগে তাকে জানতে হয়।’
রাহি মানচিত্রটির পাশে গাছের তালিকাটি রেখে দিল।
তারপর বলল,-‘আগামীকাল আমরা গ্রামের আরও পুরোনো গাছগুলো খুঁজব। শুধু গাছের নাম নয়,তাদের গল্পও জানব।’
বটদাদুর পাতার ফাঁক দিয়ে তখন দুপুরের আলো মাটিতে ছায়ার নকশা আঁকছিল।
তিন বন্ধু সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল-তাদের নতুন অভিযান শুরু হয়েছে।
এবার তাদের সামনে প্রশ্ন একটাই-
গ্রামের কত গাছের পরিচয় মানুষ এখনো মনে রেখেছে?
আর কত গাছ দাঁড়িয়ে আছে, যাদের গল্প কেউ আর জানে না?
আজকের সবুজ শিক্ষা
একটি গাছ শুধু প্রকৃতির অংশ নয়। অনেক গাছের সঙ্গে মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস ও স্থানীয় জীবনের সম্পর্ক থাকে। পুরোনো গাছের পরিচয় ও ইতিহাস সংরক্ষণও প্রকৃতি রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
আজকের ছোট্ট তথ্য
বড় গাছ অনেক পাখি,পোকামাকড় ও ছোট প্রাণীর আশ্রয় হতে পারে। তাই একটি পুরোনো গাছ রক্ষা করা মানে অনেক জীবের বাসস্থান রক্ষায়ও ভূমিকা রাখা।