মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬

জননিরাপত্তায় বড় বিনিয়োগ,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৫ প্রকল্পে বদলাচ্ছে নিরাপত্তা অবকাঠামো

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-০৮-৩১ ১১:২৮:৪৫

দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব প্রকল্পে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ দমন, ই-পাসপোর্ট, স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, মাদকাসক্তি নিরাময়, কারা ব্যবস্থাপনা ও অগ্নিনিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখা-১-এর সংকলিত প্রকল্প-তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের একটি হলো দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা ভবন কাম ব্যারাক নির্মাণ। এ প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ২৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
পুলিশের অবকাঠামো সম্প্রসারণে আরেকটি প্রকল্পের আওতায় থানা, পুলিশ ফাঁড়ি, তদন্ত কেন্দ্র, ক্যাম্প, নৌ-পুলিশ কেন্দ্র, রেলওয়ে পুলিশ স্থাপনা, পর্যটন পুলিশ কেন্দ্র ও মহাসড়ক পুলিশ স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৭৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
বিশেষায়িত নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতেও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের সন্ত্রাসবাদ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ৩ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের সরঞ্জাম সক্ষমতা বাড়াতে নেওয়া পৃথক প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলাকেও উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পুলিশের জাতীয় ও আঞ্চলিক ডিজিটাল অপরাধ তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। সরকারি অর্থায়ন ও প্রকল্প সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ তদন্তে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও বড় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। বাহিনীর সদর দপ্তর নির্মাণ প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ৫ হাজার ৪৫৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর পাশাপাশি বাহিনীর পরিচালন, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পৃথক কয়েকটি প্রকল্পও চলছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে ৭৩টি আধুনিক সীমান্ত চৌকি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গাজীপুরে নবগঠিত ৬৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া আরেক প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ২ হাজার ২৩০ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
সমুদ্রসীমায় সক্ষমতা বাড়াতেও রয়েছে বড় ধরনের বিনিয়োগ। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সরবরাহ ও নৌযান রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা স্থাপন এবং প্রতিস্থাপনযোগ্য নৌযান সংগ্রহের দুটি প্রকল্পে যথাক্রমে ৭ হাজার ৫৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা ও ২৩ হাজার ১৪৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
অভিবাসন ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সংশোধিত এই প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ৯ হাজার ৩৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নয়নেও একাধিক প্রকল্প রয়েছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি সাত বিভাগীয় শহরে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং জেলা কার্যালয় নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাত বিভাগীয় শহরের কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪১৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা।
কারা ব্যবস্থাপনায়ও চলছে সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, জামালপুর ও কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের পুনর্নির্মাণ, নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ এবং পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কমপ্লেক্স সংরক্ষণ ও আশপাশের এলাকার উন্নয়ন—এসব প্রকল্পের আওতায় রয়েছে।
অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি সেবার সক্ষমতা বাড়াতেও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এর মধ্যে ২০টি ফায়ার স্টেশন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ২০টির মধ্যে ১২টি নতুন স্টেশন নির্মাণ এবং আটটি পুনর্নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দুটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণে পৃথক প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৫ কোটি ১২ লাখ টাকা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৫টি প্রকল্পের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রচলিত নিরাপত্তা অবকাঠামোর পাশাপাশি সাইবার অপরাধ তদন্ত, প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, ই-পাসপোর্ট, সমুদ্র নিরাপত্তা, মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন এবং জরুরি সাড়াদান সক্ষমতাকেও একই পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে।
কয়েকটি প্রকল্প চলতি অর্থবছরেই শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশের বাস্তবায়ন ২০২৭ ও ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলবে। সরকারের প্রত্যাশা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য জননিরাপত্তা ও জরুরি সেবার মানও আরও কার্যকর হবে।

নিরাপত্তা প্রকল্প, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জননিরাপত্তা


এ জাতীয় আরো খবর