শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০২৬

হিমালয়ে হিমবাহ ধসের তাণ্ডব,নেপাল-তিব্বতে প্রাণহানি ৪৭২

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৬-০৮-২৮ ১০:১৫:২৯
ছবি: সংগৃহীত।

হিমালয়ের নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। সর্বশেষ হিসাবে নেপালে ৪৬৯ জন এবং চীনের তিব্বত অঞ্চলে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। দুই অঞ্চলে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৪৬৮ জন। তবে উদ্ধার ও পরিচয় শনাক্তের কাজ চলায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
বুধবার হিমালয়ের সীমান্তবর্তী এলাকায় হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার পর বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও পানি নেমে আসে। এতে ভয়াবহ স্রোতের সৃষ্টি হয়ে নেপালের বিভিন্ন জনপদ, ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেসে যায়। বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষ ভাটির দিকে ছড়িয়ে পড়ায় বহু মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

নেপালেই নিখোঁজ ৯১০
নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এখনো ৯১০ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও ভ্রমণকারীও নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন নাগরিকের সঙ্গেও এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদেরও নিখোঁজ হওয়ার তথ্য রয়েছে।

তিব্বতে ৫৫৮ জনের খোঁজ নেই
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং এলাকায় ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে তিনজনের মৃত্যুও নিশ্চিত করা হয়েছে।
নেপালে নিখোঁজ ৯১০ জনের সঙ্গে তিব্বতের ৫৫৮ জনকে হিসাব করলে দুই অঞ্চলে মোট নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৬৮।
তবে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও পর্যটন কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যানে পার্থক্য রয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা যাচাই এবং মৃতদের পরিচয় শনাক্তের সঙ্গে সঙ্গে এই হিসাব পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোই বড় বাধা
দুর্যোগের পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারীদের পৌঁছানো। বন্যার প্রবল স্রোতে বহু সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আহতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গত মানুষের কাছে খাবার ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নেপালের সেনাবাহিনী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল নদী ও ধ্বংসস্তূপ এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে।
নেপাল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে প্রায় ১০০ মানুষ আটকা পড়েছেন। এরই মধ্যে ওই এলাকা থেকে প্রায় ৩৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। টানেলে আটকে থাকা অন্যদের উদ্ধারে অভিযান চলছে।

নতুন বন্যার আশঙ্কা
বন্যার সঙ্গে ভেসে আসা বিপুল ধ্বংসাবশেষ কয়েকটি স্থানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দিয়েছে। এতে কোথাও কোথাও জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এসব স্থানে পানির চাপ ক্রমেই বাড়ায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগ সতর্কতা জারি করেছে।
দুর্যোগের কারণ নিয়ে প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পের ধারণা তৈরি হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মূল্যায়নে, হিমবাহ ও বরফ-পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকেই এই বিপর্যয় শুরু হয়েছে। ধসের সঙ্গে সৃষ্ট ভূকম্পনকে প্রথমে ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করা হলেও পরে এর প্রকৃত উৎস সম্পর্কে সংশোধিত মূল্যায়ন দেওয়া হয়। 

তিব্বতেও চলছে ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা
তিব্বতের গিরং এলাকাতেও উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ কার্যক্রমের অগ্রগতি তদারক করেছেন। প্রায় ৮০০ জরুরি উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষিত কুকুর এবং দ্রুতগতির নৌযান উদ্ধার অভিযানে যুক্ত রয়েছে।
দুর্যোগের সময় কৈলাস পর্বত ও মানসসরোবর এলাকায় তীর্থযাত্রায় থাকা বহু পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও বিপদের মধ্যে পড়েন। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া কিছু মানুষের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়কগুলো দ্রুত সচল করার নির্দেশ দিয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নতুন উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। তবে এবারের নির্দিষ্ট দুর্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা ছিল, তা নিশ্চিত করতে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
উদ্ধার অভিযান এখনো চলমান। দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতে পারলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া এবং ধ্বংসস্তূপ সরানোর সঙ্গে সঙ্গে এই ভয়াবহ দুর্যোগের পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

হিমবাহ ধস,আকস্মিক বন্যা,উদ্ধার অভিযান


এ জাতীয় আরো খবর