শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০২৬

৬৪ জেলায় রাজনৈতিক তদারকি,দায়িত্ব পেলেন ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-হুইপ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-০৮-২৮ ০৯:০৮:২৫

দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি দমন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক পর্যায়ের তদারকি জোরদার করতে নতুন ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। এ ব্যবস্থায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপসহ ৩০ জনকে এক থেকে তিনটি করে জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দায়িত্বপ্রাপ্তরা সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান প্রতিরোধ, দুর্নীতি রোধ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির অগ্রগতিও তাঁরা দেখবেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসনের সংযোগ অধিশাখা থেকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।

সরাসরি প্রশাসনিক ক্ষমতা নয়
প্রজ্ঞাপনে দায়িত্বপ্রাপ্তদের কার্যপরিধিতে মূলত তদারকি, সমন্বয় ও পরামর্শ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রয়োজনে তাঁরা জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভায়ও অংশ নিতে পারবেন।
তবে কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া, বদলি বা পদায়ন করা কিংবা প্রশাসনিক কোনো সিদ্ধান্ত বাতিল করার ক্ষমতা তাঁদের দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ জেলা প্রশাসনের প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামো বা নির্দেশনার ধারায় পরিবর্তন না এনে তার ওপর রাজনৈতিক পর্যায়ের একটি তদারকি ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।

দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়ে সরকারের উদ্বেগ
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী গঠিত সরকার দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলার উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে উন্নয়ন বরাদ্দের একটি বড় অংশ দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে এবং সেই অর্থের একাংশ বিদেশে পাচার হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, লুটপাটের অর্থের আরেকটি অংশ দেশের ভেতরে মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অবক্ষয়, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করে-এমন কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এসব বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
সরকার মনে করছে, উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় নিরাপত্তাসহ রাষ্ট্র পরিচালনার সব কার্যক্রমের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সমষ্টিগতভাবে জাতীয় সংসদ ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। টেকসই উন্নয়ন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি নির্মূলকে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই লক্ষ্যেই জেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ এবং কার্যপ্রণালি বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধানের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।

৩০ জনের মধ্যে ১৩ মন্ত্রী,১৪ প্রতিমন্ত্রী ও ৩ হুইপ
প্রজ্ঞাপনের তালিকা অনুযায়ী, দায়িত্ব পাওয়া ৩০ জনের মধ্যে ১৩ জন পূর্ণমন্ত্রী, ১৪ জন প্রতিমন্ত্রী এবং তিনজন জাতীয় সংসদের হুইপ। মন্ত্রীদের অধীনে রয়েছে ২৩ জেলা, প্রতিমন্ত্রীদের অধীনে ৩৩ জেলা এবং হুইপদের দায়িত্বে রয়েছে আট জেলা।
দায়িত্ব বণ্টনে সাতজন একটি করে, ১২ জন দুটি করে এবং ১১ জন তিনটি করে জেলার দায়িত্ব পেয়েছেন।

যেসব জেলার দায়িত্ব যাঁদের
মন্ত্রীদের মধ্যে ইকবাল হাসান মাহমুদ পেয়েছেন রাজশাহী ও নাটোরের দায়িত্ব। ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনের দায়িত্বে লালমনিরহাট, নীলফামারী ও পঞ্চগড়। আবদুল আউয়াল মিন্টু দেখবেন লক্ষ্মীপুর, নিতাই রায় চৌধুরী চুয়াডাঙ্গা এবং খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির হবিগঞ্জ জেলা।
আরিফুল হক চৌধুরী পেয়েছেন মৌলভীবাজারের দায়িত্ব। মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির দায়িত্বে চট্টগ্রাম। এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত দেখবেন শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা।
এ ছাড়া আসাদুল হাবিব দুলু পেয়েছেন ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর; মো. আসাদুজ্জামান খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট; জাকারিয়া তাহের ফেনী ও নোয়াখালী; সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ এবং সাচিং প্রু কক্সবাজার জেলার দায়িত্ব পেয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে মো. শরীফুল আলমের দায়িত্বে টাঙ্গাইল ও নরসিংদী। শামা ওবায়েদ ইসলাম দেখবেন মাদারীপুর ও শরীয়তপুর। অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের দায়িত্বে মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ।
আব্দুল বারী পেয়েছেন বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ; সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ঢাকা; মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটি; হাবিবুর রশিদ গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এবং মো. রাজিব আহসান বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরের দায়িত্ব পেয়েছেন।
মীর শাহে আলমের দায়িত্বে রয়েছে রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম। ফারজানা শারমিন দেখবেন সিরাজগঞ্জ ও পাবনা। শেখ ফরিদুল ইসলাম পেয়েছেন যশোর, মাগুরা ও নড়াইলের দায়িত্ব। ইয়াসের খান চৌধুরী দেখবেন জামালপুর ও কিশোরগঞ্জ। আহমেদ সোহেল মঞ্জুরের দায়িত্বে বরিশাল, ভোলা ও ঝালকাঠি এবং মোহাম্মদ শামীম কায়সার পেয়েছেন জয়পুরহাট ও নওগাঁ।
হুইপদের মধ্যে জি কে গউসের দায়িত্বে সিলেট ও সুনামগঞ্জ। মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ দেখবেন রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ। এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান পেয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও চাঁদপুরের দায়িত্ব।

উন্নয়ন ও জনকল্যাণেও থাকবে নজর
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্তরা জেলার সরকারি দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বন্ধ, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং পুরোনো অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেও তাঁরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবেন।
একই সঙ্গে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি তদারকি করবেন তাঁরা। প্রয়োজন অনুযায়ী জেলা পর্যায়ের সভায় অংশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার সুযোগও থাকবে দায়িত্বপ্রাপ্তদের।
নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি উন্নয়ন, জননিরাপত্তা ও সুশাসনের ওপর সরকারের রাজনৈতিক নজরদারি আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জেলা তদারকি,সুশাসন,আইনশৃঙ্খলা


এ জাতীয় আরো খবর