যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ায় সুন্দরবনসংলগ্ন বাংলাদেশের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই গুটিয়ে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের উদ্যোগে উপকৃত হাজারো মানুষের সহায়তা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি অর্জিত সাফল্যও টেকসই রাখা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
‘প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন’-এর উদ্যোগে ২০২৩ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। তবে যুক্তরাজ্যের সহায়তা বাজেট কমে যাওয়ায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জুনের মধ্যে প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে আলোচনার মাধ্যমে সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকার জাতীয় আয়ের তুলনায় বৈদেশিক সহায়তার বরাদ্দ ০ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে দেশটির দ্বিপক্ষীয় সহায়তায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাজ্যের সহায়তা যেখানে ছিল ৬ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ড, পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে ২০২৬ সালের মধ্যে ৫৭ হাজার মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানোর লক্ষ্য ছিল। কিন্তু অর্থসংকটের কারণে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার মানুষকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। চলতি বছরে প্রকল্পটির জন্য ২২ লাখ পাউন্ড পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বরাদ্দ এসেছে তার তুলনায় অনেক কম।
সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চল এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, বাঁধ ভাঙন, কৃষিজমির ক্ষতি এবং সুপেয় পানির সংকট স্থানীয় মানুষের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সৌরবিদ্যুৎ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছিল। প্রকল্পটি দ্রুত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব কার্যক্রম হঠাৎ থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক প্রধান তামান্না রহমানের মতে, অল্প সময়ে প্রকল্প গুটিয়ে ফেলতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হওয়া আস্থা ও সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ার সারাহ চ্যাম্পিয়ন এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জোট ‘বন্ড’-এর প্রধান নির্বাহী রোমিলি গ্রিনহিল এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
তবে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তর জানিয়েছে, সরাসরি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার নতুন কাঠামোর দিকে তারা এগোচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সুন্দরবনের মতো দুর্গম অঞ্চলে প্রান্তিক মানুষের কাছে সরাসরি সেবা পৌঁছে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় জনবল ও সক্ষমতা স্থানীয় সরকারের এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। ফলে উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থায়ন হঠাৎ কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষগুলো।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট
সুন্দরবন, জলবায়ু, সহায়তা