শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০২৬

'পুরোনো গাছের গোড়ায়'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-২৭ ১৬:২০:৪২
প্রতীকী ছবি

বন্ধুরা,আগের পর্বের ধাতব জিনিসটির সূত্র এবার সামনে আসবে। একই সঙ্গে গল্প নতুন একটি বাস্তব অভিযানের দিকে এগোবে।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'হারানো জলাশয়ের গল্প'
পর্ব-৬৫: 

পরদিন সকাল।
রাহি, অরণ আর শিসু আবার পুরোনো পুকুরের উত্তর পাড়ে।
সঙ্গে নাসির স্যার।
গতকাল সন্ধ্যায় যে জিনিসটা গাছের গোড়ায় ঝিলিক দিয়েছিল,সেটাই আজ তাদের কৌতূহলের কেন্দ্র।
অরণ গাছটির কাছে গিয়ে মাটি নাড়াচাড়া না করে চারপাশটা ভালো করে দেখল।
-'ওই যে!'
গাছের শিকড়ের ফাঁকে ছোট্ট একটি ধাতব বাক্সের কোণা দেখা যাচ্ছে।
শিসু উত্তেজিত হয়ে বলল,
-'পেয়ে গেছি!'

রাহি তাকে থামিয়ে দিল।
-'আস্তে। গাছের শিকড় যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।'

নাসির স্যার একটি ছোট কাঠি দিয়ে আশপাশের আলগা মাটি সরালেন।
কিছুক্ষণ পর বাক্সটি বেরিয়ে এল।
পুরোনো।
জং ধরা।
কিন্তু তালা নেই।
ঢাকনা খুলতেই তিনজন অবাক।
ভেতরে কোনো সোনা নেই।
নেই কোনো মূল্যবান জিনিস।
আছে কয়েকটি পুরোনো কাগজ,একটি হাতে আঁকা নকশা আর একটি ছোট কাঠের ফলক।

শিসু মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-'গুপ্তধন নেই!'

অরণ হেসে বলল,
-'তুমি কি সত্যিই সোনা আশা করেছিলে?'

রাহি কিন্তু কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।
প্রথম পাতায় লেখা-
'এই পুকুর একা বাঁচবে না।'

নিচে কয়েকটি ছবি।
পুকুর।
তার পাশে গাছ।
একদিকে বাঁশঝাড়।
আর একটি সরু নালা।

নাসির স্যার নকশাটি মেলে ধরলেন।
-'এটা তো পুরো এলাকার জল চলাচলের পুরোনো পরিকল্পনা!'

অরণ অবাক হয়ে বলল,
-'মানে?'

স্যার বুঝিয়ে বললেন,
-'বর্ষায় অতিরিক্ত পানি কোথা দিয়ে আসবে,কোথায় জমবে,আর কীভাবে ধীরে ধীরে অন্য জায়গায় যাবে-সেই ব্যবস্থা দেখানো হয়েছে।'

রাহি নকশার একটি জায়গায় আঙুল রাখল।
-'এই নালাটা তো আমরা গত পর্বে দেখেছিলাম!'
-'ঠিক তাই।'

সবাই চুপ।

হঠাৎ শিসু বলল,
-'তাহলে নালাটা যদি বন্ধ হয়ে যায়?'

নাসির স্যার বললেন,
-'পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পুকুরের স্বাভাবিক জলধারণ ব্যবস্থাও নষ্ট হতে পারে।'

রাহি দ্রুত পুরোনো নকশার সঙ্গে বর্তমান জায়গাটা মিলিয়ে দেখতে লাগল।
তারপর বলল,
-'এখানে একটা সমস্যা আছে।'
-'কী?'
-'নকশায় যে জায়গাটা খোলা দেখানো হয়েছে,সেখানে এখন একটা মাটির বাঁধ।'

অরণ বলল,
-'সেটা কি আমরা সরিয়ে দেব?'
-'না,' স্যার বললেন। 'নিজেরা কিছু সরানো যাবে না। আগে জানতে হবে বাঁধটা কেন করা হয়েছিল।'

ঠিক তখন হাবিবুর চাচা সেখানে এসে পৌঁছালেন।
নকশাটা দেখেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন।
-'এটা কোথায় পেলে?'

রাহি বলল,
-'গাছের গোড়ার বাক্সে।'

চাচা নকশাটার ওপর হাত রাখলেন।
-'এটা রহমান মাস্টার আর গ্রামের কয়েকজন মানুষের তৈরি পরিকল্পনা।'
-'কেন?' অরণ জানতে চাইল।
-'বন্যার সময় গ্রামের ঘরবাড়ি যেন পানিতে ডুবে না যায়,আবার পুকুর-নালা যেন শুকিয়েও না যায়—সেই জন্য।'

শিসু বলল,
-'তাহলে এত ভালো ব্যবস্থা ছিল!'

চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
-'সময় বদলেছে। অনেক জায়গায় মাটি ভরাট হয়েছে। নালা সরু হয়েছে। কেউ আর পুরোনো পরিকল্পনার কথা মনে রাখেনি।'

রাহি নকশার দিকে তাকিয়ে বলল,
-'তাহলে আমাদের কাজ শুধু পুকুর পরিষ্কার করা নয়। পুরো জলপথটা বুঝতে হবে।'

নাসির স্যার হাসলেন।
-'এবার তোমরা সত্যিকারের গবেষক হওয়ার পথে হাঁটছ।'

তিন বন্ধু উৎসাহিত হয়ে উঠল।
তারা ঠিক করল, নিজেরা কোনো পরিবর্তন করবে না।
প্রথমে এলাকার বর্তমান নালা,পুকুর ও পানি যাওয়ার পথের একটি নতুন মানচিত্র তৈরি করবে।
তারপর গ্রামের বড়দের নিয়ে বসবে।
কোথায় পানি আটকে যায়?
কোথায় ময়লা জমে?
কোথায় গাছ কাটা হয়েছে?
কোথায় নালা বন্ধ?
সব লিখে রাখা হবে।

শিসু খাতা খুলে প্রথম পাতায় বড় করে লিখল-
-'আমাদের জলপথের মানচিত্র'

অরণ বলল,
-'নামটা একটু বড় হয়ে গেল না?'

শিসু বলল,
-'কাজটাও তো বড়!'

রাহি হেসে ফেলল।
ঠিক তখন বটবনের দিক থেকে একটি শালিক উড়ে এসে পুরোনো গাছটির ডালে বসল।
তার ঠোঁটে ছোট্ট কিছু।
পাখিটি সেটা মাটিতে ফেলল।
একটি শুকনো পাতা।
পাতাটিতে অদ্ভুতভাবে আঁকা একটি দাগ।
অরণ সেটা তুলে নিয়ে বলল,
-'এটা আবার কী?'

নাসির স্যার পাতাটি দেখে হেসে বললেন,
-'সম্ভবত কোনো পোকা বা প্রাকৃতিক দাগ। সবকিছুর মধ্যে রহস্য খুঁজতে হবে না।'

তিনজন হেসে উঠল।
রাহি বলল,
-'ঠিক বলেছেন। আজ আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শিখলাম-প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছুকে রহস্য বলা ঠিক নয়।'

শিসু বলল,
-'তাহলে আজকের রহস্য শেষ?'

রাহি বলল,
-'হ্যাঁ। কারণ আমরা জেনে গেছি বাক্সটা কেন রাখা হয়েছিল।'

অরণ যোগ করল,
-'কিন্তু কাজটা তো মাত্র শুরু।'

তিনজন পুকুরের দিকে তাকাল।
জলের ওপর তখন সকালের আলো।
শাপলা দুলছে।
পাখিরা ডাকছে।
আর শুকনো নালার পুরোনো পথ যেন তাদের নতুন দায়িত্বের দিকে ডাকছে।

রাহি ডায়েরিতে লিখল,
'আজ আমরা গুপ্তধন পাইনি। পেয়েছি তার চেয়েও মূল্যবান কিছু-একটি পুরোনো মানুষের ভবিষ্যৎ ভাবার ক্ষমতার প্রমাণ।'

তারপর লিখল,
'পুরোনো জ্ঞানকে শুধু জাদুঘরে রেখে দিলে হবে না। ভালো হলে তাকে নতুন সময়ের কাজে লাগাতে হয়।'

আজকের সবুজ শিক্ষাঃ
প্রকৃতির কোনো একটি অংশ আলাদা করে রক্ষা করলেই সবসময় যথেষ্ট হয় না। পুকুর, খাল, নালা, গাছ ও আশপাশের জমি-সব মিলেই একটি পরিবেশব্যবস্থা তৈরি করে।

আজকের ছোট্ট তথ্যঃ
জলাধার ও নালার স্বাভাবিক সংযোগ বৃষ্টির পানি ধারণ ও প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নালা ভরাট বা পানি চলাচলের পথ বন্ধ হলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

রাহি, অরণ ও শিসু এবার তৈরি করবে তাদের এলাকার জলপথের নতুন মানচিত্র।
কিন্তু পুরোনো নকশার সঙ্গে বর্তমানের মানচিত্র মিলিয়ে তারা দেখবে-'একটি নীল রেখা হঠাৎ কোথাও গিয়ে শেষ হয়ে গেছে।'
সেই জায়গাটি খুঁজতে গিয়ে তারা পৌঁছাবে গ্রামের এমন এক জায়গায়,যেখানে বহু বছর ধরে পানি জমে না।
কিন্তু মাটির নিচে নাকি এখনো বয়ে যায় একটি পুরোনো জলধারা।
সেখানেই শুরু হবে পরের নতুন অভিযান। 


এ জাতীয় আরো খবর