বুধবার, আগস্ট ২৬, ২০২৬

'শাপলার নিচে লুকানো বার্তা'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-২৬ ১৭:২১:৩৮
প্রতীকী ছবি

বন্ধুরা,আগের পর্বের কাঁচের শিশি ও শাপলার সূত্র থেকেই গল্প এগোচ্ছে। আজকের ঘটনাতেই একটি অর্থপূর্ণ সমাধান থাকবে এবং রাহি, অরণ ও শিসুর সামনে নতুন কাজের পথ খুলবে।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'হারানো জলাশয়ের গল্প'
পর্ব-৬৪: 

সকালের রোদ পুকুরের পানিতে ঝিলমিল করছে।
পুকুরের পাড়ে আজ অনেক মানুষ।
কেউ আবর্জনা সংগ্রহ করছে।
কেউ শুকনো ডাল সরাচ্ছে।
কেউ আবার পাড়ের মাটি যাতে নষ্ট না হয়, সেদিকে নজর রাখছে।

রাহি, অরণ আর শিসু কাজের ফাঁকে পুকুরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল।
শিসু হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
-'ওই দেখো! শাপলার নিচে কিছু একটা!'

অরণ ঝুঁকে তাকাল।
পানির ধারে কয়েকটি শুকনো শাপলার পাতা জমে আছে।
তার নিচে কাদার মধ্যে আটকে আছে একটি ছোট কাঁচের শিশি।

রাহি বলল,
-'ওটা কেউ ফেলে গেছে নাকি?'

নাসির স্যার কাছে এসে বললেন,
-'সাবধানে তুলতে হবে। ভেঙে গেলে কাঁচে হাত কেটে যেতে পারে।'

একটি কাপড় দিয়ে শিশিটি তুলে আনা হলো।
ভেতরে কিছু একটা আছে।
শিসুর চোখ চকচক করছে।
-'কাগজ!'

অরণ বলল,
-'এত পুরোনো কাগজ এখানে এল কীভাবে?'

শিশিটির মুখ খুলে কাগজটি বের করা হলো।
কাগজ হলদেটে।
ভাঁজ খুলতেই দেখা গেল হাতে লেখা কয়েকটি লাইন।
রাহি ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করল-
'যদি কখনো এই পুকুরের পানি আবার পরিষ্কার হয়,তবে শাপলাগুলোকে জায়গা দিও। তারা শুধু সৌন্দর্য নয়,এই জলাশয়ের গল্পেরও অংশ।'
তার নিচে একটি নাম।
'রহমান।'

তিনজন একসঙ্গে তাকাল।
অরণ বলল,
-'রহমান মাস্টার!'

নাসির স্যার কাগজটি হাতে নিয়ে বললেন,
-'সম্ভবত তিনিই।'

কাগজের নিচে আরও লেখা ছিল-
'পুকুরের সবকিছু পরিষ্কার করতে যেও না। কিছু জিনিস প্রকৃতির নিজের। মানুষকে শুধু ময়লাটা সরাতে হবে।'

রাহি মুগ্ধ হয়ে বলল,
-'তিনি অনেক আগেই বুঝেছিলেন!'

নাসির স্যার মাথা নেড়ে বললেন,
-'প্রকৃতি পরিষ্কার করার নামে প্রকৃতিকে বদলে ফেলা ঠিক নয়।'

শিসু শাপলার দিকে তাকাল।
-'তাহলে শাপলা থাকবে?'
-'অবশ্যই,' স্যার বললেন। 'যদি সেগুলো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে থাকে এবং জলাশয়ের ভারসাম্য নষ্ট না করে, তাহলে তাদেরও এই পরিবেশের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।'

অরণ বলল,
-'মানে আমাদের কাজ হবে ময়লা সরানো,কিন্তু প্রকৃতির নিজের জিনিসকে ময়লা ভেবে সরিয়ে ফেলা নয়।'

'ঠিক তাই।'
রাহি আবার কাগজটির দিকে তাকাল।
-'কিন্তু এই বার্তাটা এত বছর পরেও এখানে রয়ে গেল কীভাবে?'

হাবিবুর চাচা,যিনি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মৃদু হেসে বললেন,
-'সম্ভবত রহমান মাস্টারই রেখে গিয়েছিলেন। তিনি জানতেন,কোনোদিন না কোনোদিন কেউ এই পুকুরটাকে আবার খুঁজে নেবে।'

শিসু অবাক হয়ে বলল,
-'তিনি কি জানতেন আমরা আসব?'

সবাই হেসে উঠল।
হাবিবুর চাচা বললেন,
-'তোমাদের কথা তিনি জানতেন না। কিন্তু তিনি জানতেন,ভালো কাজের প্রয়োজন একদিন আবার তৈরি হবে।'

কথাটা শুনে রাহি চুপ করে গেল।
তার মনে হলো, সত্যিই তো-
মানুষ চলে যায়।
কিন্তু ভালো চিন্তা থেকে যায়।
কখনো একটি ঘণ্টায়।
কখনো একটি বাঁশিতে।
কখনো একটি পুরোনো কাগজে।
আর কখনো একটি শিশুর হাতে।

অরণ কাগজটি দেখে বলল,
-'এখানে আরেকটা দাগ আছে।'

কাগজের এক কোণে আঁকা একটি ছোট মানচিত্র।
একটি পুকুর।
তার পাশে একটি গাছ।
আর একটি তীরচিহ্ন।
তীরটি পুকুরের উত্তর পাড়ের দিকে।

শিসু উত্তেজিত হয়ে বলল,
-'আবার রহস্য!'

রাহি হেসে বলল,
-'রহস্য থাকতেই পারে। কিন্তু আগে আজকের কাজ শেষ করি।'

সেদিন তারা পুকুরের আবর্জনা পরিষ্কার করল।
পলিথিন আলাদা করা হলো।
প্লাস্টিক আলাদা করা হলো।
কাঁচের টুকরো সাবধানে সংগ্রহ করা হলো।
কিন্তু শাপলা রয়ে গেল।
পানির ধারে ছোট্ট একটি জায়গায় পাখিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ও রাখা হলো।
বিকেলে কাজ শেষ হলে পুকুরটাকে যেন অন্যরকম লাগল।
পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
কিন্তু আগের চেয়ে অনেক স্বচ্ছ।
জলের ওপর ভেসে থাকা শাপলাগুলো বাতাসে দুলছে।
একটি ব্যাঙ শাপলার পাতার ওপর উঠে বসেছে।

রাহি বলল,
-'আজ বুঝলাম,প্রকৃতিকে সুন্দর করার মানে সবকিছু সরিয়ে ফেলা নয়।'

অরণ যোগ করল,
-'কিছু জিনিসকে শুধু তার মতো থাকতে দিতে হয়।'

শিসু হেসে বলল,'
-আর কিছু জিনিসকে সরাতেই হয়-যেমন পলিথিন!'

তিনজন একসঙ্গে হেসে উঠল।
সন্ধ্যার আগে রাহি পুরোনো কাগজটির অনুলিপি নিজের খাতায় লিখে রাখল।
তারপর মূল কাগজটি নাসির স্যারের কাছে দিয়ে বলল,
-'এটা সংরক্ষণ করা দরকার।'

স্যার বললেন,
-'অবশ্যই।'

রাহি শেষবারের মতো উত্তর পাড়ের দিকে তাকাল।
সেখানে একটি পুরোনো গাছ দাঁড়িয়ে আছে।
তার গোড়ায় যেন কিছু একটা চকচক করছে।
অরণও দেখে ফেলেছে।
-'রাহি... ওইটা কী?'

শিসু বাঁশি হাতে নিল।
-'চলো!'

রাহি হাসল।
-'আজ আর নয়। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। কাল সকালে যাব।'

তিনজন পুকুর থেকে ফিরে গেল।
পেছনে পড়ে রইল শাপলা,পুকুর আর সেই পুরোনো গাছ।

আর গাছটির গোড়ায়-
অন্ধকার নামার আগেই যেন একটি ছোট্ট ধাতব জিনিস আবার ঝিলিক দিয়ে উঠল।

আজকের সবুজ শিক্ষাঃ
প্রকৃতি রক্ষা মানে প্রকৃতিকে নিজের ইচ্ছামতো সাজানো নয়। কোনটি মানুষের তৈরি আবর্জনা এবং কোনটি প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ-এই পার্থক্য বুঝে কাজ করতে হয়।

আজকের ছোট্ট তথ্যঃ
শাপলা বাংলাদেশের পরিচিত জলজ উদ্ভিদগুলোর একটি। জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশে শাপলা নানা ছোট প্রাণীর আশ্রয় ও খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ হতে পারে।

পুকুরের উত্তর পাড়ের সেই গাছটির গোড়ায় কী পাওয়া গেল?
পরের পর্বে রাহি, অরণ ও শিসু আবিষ্কার করবে একটি পুরোনো ধাতব বাক্স। কিন্তু বাক্সের ভেতরের জিনিস কোনো গুপ্তধন নয়-বরং এমন একটি 'সবুজ পরিকল্পনার নকশা', যা বহু বছর আগে তৈরি হয়েছিল এবং আজকের পুকুরকে নতুনভাবে বাঁচানোর কাজে আশ্চর্যভাবে কাজে লাগতে পারে।


এ জাতীয় আরো খবর