মঙ্গলবার, আগস্ট ২৫, ২০২৬

'তিন শব্দের বাঁশি'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-২৩ ০৮:৩৭:৫৫
প্রতীকী ছবি

বন্ধুরা,গত পর্বে বটবনের পুরোনো পাঠশালা আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। আজ আমরা সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ে পা রাখছি। এবার বাঁশবন, একটি অচেনা বাঁশি এবং তিন বন্ধুর সামনে খুলে যাবে এক নতুন পথ।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'বাঁশবনের ওপারে'
পর্ব-৬১:

বটবনের পাঠশালায় আজ ছুটির দিন।
তবু সকাল থেকেই সেখানে শিশুদের আনাগোনা।
কেউ গল্পের বই পড়ছে।
কেউ পাখির ছবি আঁকছে।
কেউ আবার বটগাছের নিচে বসে নাসির স্যারের কথা শুনছে।

রাহি, অরণ আর শিসু একটু দূরে বসে গতকালের ঘণ্টাটির দিকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ-
'রাহি!'
একটি ছোট ছেলে দৌড়ে তাদের কাছে এল।
তার হাতে কিছু একটা।
-'এটা তোমাদের জন্য।'

রাহি অবাক হয়ে বলল,
-'আমাদের জন্য?'

ছেলেটি মাথা নেড়ে বাঁশের তৈরি ছোট একটি বাঁশি এগিয়ে দিল।
-'বাঁশবনের পাশে পেয়েছি।'

অরণ বাঁশিটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখল।
সাধারণ বাঁশির মতোই।
কিন্তু বাঁশির গায়ে ছোট ছোট অক্ষরে কিছু লেখা।

রাহি ধীরে ধীরে পড়ল-
-'ওপারের পথ দেখো।'

তিনজন একসঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
শিসু ফিসফিস করে বলল,
-'ওপারের পথ মানে?'

অরণ বাঁশিটা উল্টেপাল্টে দেখল।
-'এখানে আর কিছু লেখা নেই।'

রাহি বলল,
-'বাঁশিটা কোথায় পাওয়া গেছে বলেছিলে?'

ছেলেটি দূরের বাঁশবনের দিকে আঙুল দেখাল।
-'ওইখানে। শুকনো নালার পাশে।'

নাসির স্যারকে সব জানানো হলো।
তিনি বাঁশিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন।
-'পুরোনো মনে হচ্ছে। তবে কে বানিয়েছে,সেটা এখনই বলা যাবে না।'

শিসু বলল,
-'আমরা কি বাঁশবনে গিয়ে দেখতে পারি?'

স্যার বললেন,
-'যেতে পারো। কিন্তু সবাই একসঙ্গে যাবে। কোনো অচেনা জায়গায় একা যাবে না। আর বাঁশঝাড়ের ভেতরে অনুমতি ছাড়া ঢুকবে না।'

তিন বন্ধু খুশি।
কিছুক্ষণ পর তারা বাঁশবনের কাছে পৌঁছাল।
দূর থেকেই শোনা যাচ্ছে বাতাসের শব্দ।

'শোঁ... শোঁ...'
বাঁশগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘষা খেয়ে অদ্ভুত সুর তুলছে।

শিসু বলল,
-'মনে হচ্ছে বাঁশবন নিজেই গান গাইছে!'

অরণ হেসে বলল,
-'তুমি আবার কবি হয়ে গেলে!'

রাহি কিন্তু বাঁশবনের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে আছে।
-'ওই দেখো।'

শুকনো নালার পাশে মাটিতে একটা সরু পথ।
পথটা বাঁশঝাড়ের একদিক থেকে শুরু হয়ে অন্যদিকে চলে গেছে।
কিন্তু মাঝখানে এসে হঠাৎ হারিয়ে গেছে।
অরণ নিচু হয়ে মাটি দেখল।
-'এখানে কেউ যাতায়াত করত মনে হচ্ছে।'

শিসু বলল,
-'মানুষ?'
-'নিশ্চিত না।'

ঠিক তখনই বাঁশির ভেতর থেকে ক্ষীণ একটা শব্দ বের হলো।
ফুঁ না দিয়েও!

তিনজন চমকে উঠল।
রাহি বাঁশিটা হাতে নিল।
বাতাস বাঁশির ছিদ্রের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।
সেই বাতাসেই তৈরি হচ্ছে মৃদু সুর।
-'এটাই কি সেই সংকেত?' শিসু বলল।

নাসির স্যার হেসে বললেন,
-'প্রকৃতিতে অনেক শব্দেরই স্বাভাবিক কারণ থাকে। রহস্য খুঁজবে,কিন্তু আগে কারণটাও খুঁজবে।'

তারা আরও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল।
হঠাৎ অরণ একটি পুরোনো বাঁশের খুঁটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-'ওইখানে কিছু ঝুলছে!'

দূর থেকে দেখা গেল,একটি ছোট কাঠের ফলক।
তবে বাঁশঝাড়ের ভেতরে না গিয়ে তারা সেখানেই দাঁড়িয়ে দেখল।

ফলকে আঁকা-
একটি পাখি।
তার নিচে একটি তীরচিহ্ন।
তীরটি বাঁশবনের পাশের শুকনো নালার দিকে নির্দেশ করছে।

রাহি বলল,
-'আমাদের রহস্যটা বাঁশবনের ভেতরে নয়।'

অরণ মাথা নেড়ে বলল,
-'নালার দিকে!'

শিসু উত্তেজনায় বলল,
-'চলো!'

কিন্তু নাসির স্যার হাত তুলে থামালেন।
-'আজ নয়। এখন দুপুর হয়ে গেছে। জায়গাটা অপরিচিত। আগে গ্রামের বড়দের কাছ থেকে জানতে হবে, এই নালার ইতিহাস কী।'

শিসু একটু হতাশ হলেও মাথা নেড়ে রাজি হলো।

ফেরার সময় রাহি বাঁশিটা আবার হাতে নিল।
সে মৃদু স্বরে বলল,
-'তিনটি শব্দ আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে,কে জানে!'

অরণ বলল,
-'কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার-যে-ই বাঁশিটা বানিয়ে থাকুক, সে চাইছে কেউ এই পথটা খুঁজে বের করুক।'

শিসু পেছনে তাকিয়ে বাঁশবনের দিকে তাকাল।
বাতাসে বাঁশগুলো আবার দুলছে।

শোঁ...

শোঁ...

মনে হলো, দূর থেকে কেউ যেন খুব আস্তে বলছে-
'এসো...'

রাহি হেসে বলল,
-'কাল আবার আসব।'

বটবনের দিকে ফেরার সময় তার মনে হলো,আজকের আবিষ্কার শুধু একটি বাঁশি নয়।
এটি হয়তো কোনো পুরোনো গল্পের শুরু।
আর সেই গল্পের পরের দরজা খুলবে শুকনো নালার ওপারে।

আজকের সবুজ শিক্ষাঃ
অচেনা জায়গায় কৌতূহল থাকা ভালো, কিন্তু কৌতূহলের সঙ্গে সতর্কতাও জরুরি। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে, তবে কোনো প্রাণী, গাছ বা প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি না করে।

আজকের ছোট্ট তথ্যঃ
বাঁশ এক ধরনের ঘাসজাত উদ্ভিদ। অনেক বাঁশ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং মাটি ধরে রাখা, কার্বন ধারণ ও নানা প্রাণীর আশ্রয় তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

পরের দিন রাহি, অরণ ও শিসু গ্রামের কয়েকজন বড় মানুষের সঙ্গে শুকনো নালার কাছে যাবে। সেখানে তারা খুঁজে পাবে মাটির নিচে নেমে যাওয়া কয়েকটি পুরোনো ইটের ধাপ।

কিন্তু সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হবে-সিঁড়িগুলো নেমে গেছে এমন একটি জায়গার দিকে,যেখানে বহু বছর ধরে কেউ যায়নি।
এবার শুরু হবে আমাদের নতুন রহস্যের আসল অভিযান।


এ জাতীয় আরো খবর