মঙ্গলবার, আগস্ট ২৫, ২০২৬

'পুকুরের জলে কার ছায়া?'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-২৫ ১৬:৩৭:৫০
প্রতীকী ছবি

বন্ধুরা,এবার আগের পর্বের পুকুরের সূত্রটিই এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে রহস্য থাকবে,কিন্তু আজকের ঘটনাটির একটি পরিষ্কার সমাধানও হবে।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'হারানো জলাশয়ের গল্প'
পর্ব-৬৩: 

বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে।
রাহি, অরণ আর শিসু আবার সেই পুরোনো পুকুরের পাড়ে।
আজ তাদের হাতে কোনো কোদাল নেই।
নেই কোনো পুরোনো বাক্সও।
শুধু তিনটি খাতা আর একটি দূরবীন।
কারণ আজ তারা পুকুরটি পরিষ্কার করার আগে জানতে চায়-এই পুকুরে এখনো কারা বাস করে।

অরণ দূরবীন চোখে তুলে বলল,
-'ওই দেখো! পানির ধারে একটা পাখি।'

রাহি তাকিয়ে বলল,
-'ওটা বক।'

শিসু বলল,
-'আর ওইদিকে ছোট ছোট কী যেন লাফাচ্ছে!'

তারা একটু কাছে যেতেই—
ছপাৎ!
কাদার ভেতর থেকে কিছু একটা পানিতে ঝাঁপ দিল।

শিসু চমকে পিছিয়ে গেল।
-'ওই তো! পুকুরের জলে কার ছায়া!'

অরণ হাসল।
-'ভূত হলে এত সুন্দর করে পানিতে ঝাঁপ দিত না।'

তিনজন মাটির দিকে তাকাল।
কাদার ওপর ছোট ছোট পায়ের ছাপ।
চারটি আঙুলের মতো চিহ্ন।
পাশে পানিতে সরু দাগ।

রাহি ফিসফিস করে বলল,
-'এগুলো কোনো পাখির পায়ের ছাপ নয়।'

নাসির স্যার তখন তাদের সঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি ছাপগুলো দেখে বললেন,
-'সম্ভবত কোনো জলচর প্রাণী এখানে এসেছে। কিন্তু শুধু পায়ের ছাপ দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।'

শিসু বলল,
-'তাহলে আজ রাতেই পাহারা দেব!'

রাহি হেসে বলল,
-'আমরা তিনজন রাতভর এখানে বসে থাকব?'

নাসির স্যার মাথা নাড়লেন।
-'না। বন্যপ্রাণী দেখতে হলে তাকে বিরক্ত না করে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।'

তাই তারা পুকুরের পাশে একটি নিরাপদ জায়গায় দূরবীন রেখে গেল।
পরদিন সকালে আবার তারা সেখানে এল।
অরণ প্রথমেই দৌড়ে গিয়ে বলল,
-'এখানে এসো!'

পুকুরের কাদায় আগের দিনের চেয়েও স্পষ্ট ছাপ।
আর একটু দূরে দেখা গেল ছোট্ট একটি গর্ত।
রাহি হাঁটু গেড়ে বসে গর্তটির দিকে তাকাল।
হঠাৎ ভেতর থেকে দুটি চকচকে চোখ দেখা গেল।
শিসু নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।
তারপর প্রাণীটি ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল।
একটি ছোট জলচর প্রাণী।
বাদামি রঙের শরীর।
চঞ্চল চোখ।
পানির ধারে কয়েক পা এগিয়ে আবার ঝপ করে পানিতে নেমে গেল।

নাসির স্যার বললেন,
-'এটি সম্ভবত বেজি বা অন্য কোনো ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী হতে পারে। তবে নিশ্চিত পরিচয় জানতে ছবি দেখে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া ভালো।'

শিসু অবাক হয়ে বলল,
-'মানে এতদিন ধরে এই পুকুরে প্রাণীরা থাকত,আর আমরা জানতামই না!'

রাহি বলল,
-'আমরা পুকুরটাকে শুধু শুকনো একটা জায়গা ভেবেছিলাম। আসলে এটা একটা জীবন্ত পৃথিবী।'

অরণ খাতায় লিখল-
'পুকুরের প্রথম রহস্যের সমাধান: এখানে এখনো প্রাণীরা আসে।'

কিন্তু ঠিক তখনই অরণ আরও একটি বিষয় দেখতে পেল।
পুকুরের এক পাশে ময়লার স্তূপ।
পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল,পুরোনো খাবারের প্যাকেট।

শিসুর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
-'আমরা যদি পুকুর পরিষ্কার করি,তাহলে এই প্রাণীগুলোও নিরাপদ থাকবে।'

রাহি বলল,
-'হ্যাঁ। তবে আমরা নিজেদের মতো করে সব তুলে ফেলব না। আগে বড়দের নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।'

নাসির স্যার বললেন,
-'ঠিক কথা। জলাশয় পরিষ্কার করতে গিয়ে অনেক সময় ভেতরের প্রাণী বা উদ্ভিদের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই কী সরানো যাবে আর কী রাখা দরকার, সেটা জেনে কাজ করতে হবে।'

সেদিন তারা একটি নতুন পরিকল্পনা করল।
প্রথমে পুকুরের চারপাশের আবর্জনা পরিষ্কার করা হবে।
তারপর গ্রামের মানুষকে বোঝানো হবে,এখানে আর ময়লা ফেলা যাবে না।
পুকুরের স্বাভাবিক পরিবেশ যেন নষ্ট না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হবে।

শিসু হঠাৎ বলল,
-'আর একটা নাম দিই না পুকুরটার?'

অরণ বলল,
-'কী নাম?'

শিসু একটু ভেবে বলল,
-'ফিরে আসা পুকুর।'

রাহি হেসে বলল,
-'না। পুকুর তো কোথাও যায়নি। আমরা বরং তাকে ভুলে গিয়েছিলাম।'

অরণ বলল,
-'তাহলে নাম হতে পারে-'মনে পড়া পুকুর'!'

সবাই হেসে উঠল।

নাসির স্যার বললেন,
-'নাম যাই দাও,কাজটা যেন মনে থাকে।'

সন্ধ্যার আগে রাহি পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো চারদিকে তাকাল।
জলে অস্তগামী সূর্যের আলো পড়েছে।
একটি বক ধীরে ধীরে উড়ে গেল।
দূরে ব্যাঙ ডাকল।
ঝোপের আড়াল থেকে আবার সেই ছোট প্রাণীটির চোখ দেখা গেল।

রাহি আস্তে বলল,
-'আমরা তোমাদের দেখতে পেয়েছি। এবার তোমাদের থাকার জায়গাটাও রক্ষা করব।'

অরণ পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
-'আমাদের অভিযান তাহলে এখন পুকুরে!'

শিসু বাঁশিটা হাতে তুলে বলল,
-'আর এই বাঁশি বাজবে শুধু রহস্যের জন্য নয়-মানুষকে ডাকতেও।'

রাহি মুচকি হাসল।
-'ঠিক তাই।'

বাঁশিতে একটি ছোট্ট সুর উঠল।
সন্ধ্যার বাতাস সেই সুর নিয়ে ছড়িয়ে গেল গ্রামের দিকে।
আর সেই সুর শুনে পরদিন সকালে গ্রামের কয়েকজন মানুষ নিজেরাই পুকুরের পাড়ে এসে দাঁড়ালেন।
কেউ ঝুড়ি নিয়ে।
কেউ দড়ি নিয়ে।
কেউ শুধু নিজের দুটো হাত নিয়ে।

রাহি অবাক হয়ে বলল,
-'দেখেছ?'

অরণ হাসল।
-'একটা বাঁশির সুর এত মানুষকে ডাকতে পারে!'

শিসু বলল,
-'তাহলে এবার সত্যিকারের কাজ শুরু।'

আজকের সবুজ শিক্ষাঃ
কোনো জলাশয়কে পরিষ্কার করার আগে সেখানে থাকা প্রাণী ও উদ্ভিদের কথা ভাবতে হবে। প্রকৃতি রক্ষা মানে শুধু ময়লা সরানো নয়; তার স্বাভাবিক ভারসাম্যও রক্ষা করা।

আজকের ছোট্ট তথ্যঃ
পুকুর, খাল ও জলাভূমি অনেক ছোট প্রাণীর আশ্রয়স্থল। এসব জায়গা পরিষ্কার ও নিরাপদ থাকলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যও টিকে থাকার সুযোগ পায়।


পুকুর পরিষ্কারের প্রথম দিনেই রাহি, অরণ ও শিসু পানির ধারে একটি অদ্ভুত জিনিস দেখতে পাবে-শুকনো শাপলার পাতার নিচে আটকে থাকা একটি পুরোনো কাঁচের শিশি।
তার ভেতরে থাকবে একটি ভাঁজ করা কাগজ।
এবারের রহস্যটি তাদের নিয়ে যাবে 'পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক পুরোনো মানুষের গল্পের কাছে'-তবে সেই গল্পের সঙ্গে বর্তমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজও জড়িয়ে থাকবে।


এ জাতীয় আরো খবর