শুক্রবার, আগস্ট ২১, ২০২৬

'ঘণ্টাটি আবার বাজবে'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-২১ ১১:৩৫:৫৮
প্রতীকী ছবি

বন্ধুরা,আজ পর্ব-৬০। আজকের পর্বে শুধু রহস্যের সমাধান হবে না, রাহি, অরণ ও শিসু বুঝবে-একটি জায়গার স্মৃতি কীভাবে নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন হয়ে ফিরে আসতে পারে। 

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'হারানো পথের সন্ধানে'
পর্ব-৬০: 

বটবনের সকালটা অন্য দিনের চেয়ে যেন একটু আলাদা।
রাহি, অরণ আর শিসু তিনজনই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরোনো পাথরের চৌকিটির পাশে।
তাদের মাঝখানে রাখা মরচে ধরা পিতলের ঘণ্টাটি।
শিসু হাত বাড়িয়ে আবার সরিয়ে নিল।
-'বাজাব না?'

অরণ বলল,
-'আগে জানতে হবে এটা সত্যিই পাঠশালার ঘণ্টা কি না।'

রাহি মাথা নেড়ে বলল,
-'আজ আমরা রহস্যের উত্তর খুঁজতে যাচ্ছি।'

নাসির স্যার তাদের নিয়ে গেলেন গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষটির কাছে।
তার নাম হাবিবুর চাচা।
বয়স অনেক।
কথা বলার সময় তিনি মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করেন,যেন পুরোনো দিনের কোনো ছবি মনে করার চেষ্টা করছেন।
রাহি ঘণ্টাটি সামনে রাখতেই বৃদ্ধ মানুষটি হঠাৎ থেমে গেলেন।
-'এটা... কোথায় পেলে তোমরা?'

অরণ বলল,
-'বটবনের পুরোনো পাঠশালার জায়গা থেকে।'

হাবিবুর চাচা ঘণ্টাটির গায়ে হাত রাখলেন।
কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না।
তারপর ধীরে ধীরে হাসলেন।
-'আমি এই ঘণ্টার শব্দ শুনেছি।'

তিন বন্ধুর চোখ বড় হয়ে গেল।
শিসু প্রায় ফিসফিস করে বলল,
-'সত্যি?'
-'হ্যাঁ। তখন আমি তোমাদের বয়সের চেয়েও ছোট ছিলাম।'

বৃদ্ধ মানুষটি বলতে শুরু করলেন-
অনেক বছর আগে বটগাছটির নিচে ছোট্ট একটি পাঠশালা বসত।
কোনো বড় ঘর ছিল না।
বটগাছের ছায়াই ছিল ছাদ।
মাটিই ছিল উঠোন।
কাঠের ছোট পিঁড়ি ছিল বেঞ্চ।

সকাল হলে ঘণ্টা বাজত।
শিশুরা ছুটে আসত।
কেউ বই নিয়ে।
কেউ খাতা নিয়ে।
কেউ আবার শুধু গল্প শুনতে।

রাহি মুগ্ধ হয়ে শুনছিল।
-'কে পড়াতেন?'

হাবিবুর চাচা বললেন,
-'রহমান মাস্টার। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি বলতেন,বই পড়ে জ্ঞানী হও,কিন্তু গাছপালা দেখে পৃথিবীকে চিনতে শেখো।'

অরণ বলল,
-'তাহলে তিনি তো আমাদের মতোই ভাবতেন!'

বৃদ্ধ মানুষটি হেসে বললেন,
-'তোমাদের মতো আরও অনেক শিশু তখন এখানে বসত।'

হঠাৎ তাঁর মুখটা একটু বিষণ্ন হয়ে গেল।
-'তারপর এক বর্ষায় বটবনের পাশের পথটা ভেঙে যায়। পাঠশালাও আর চালানো সম্ভব হয়নি। সবাই ভেবেছিল,একদিন আবার শুরু হবে। কিন্তু সময় চলে গেল।'

শিসু ঘণ্টাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-'আর ঘণ্টাটা?'

হাবিবুর চাচা বললেন,
-'শেষ দিন রহমান মাস্টার নিজেই ঘণ্টাটা খুলে রেখেছিলেন। বলেছিলেন,একদিন হয়তো আবার কোনো শিশু এই ঘণ্টা বাজাবে।'

তিন বন্ধু একে অপরের দিকে তাকাল।
রাহির বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।
এত বছর ধরে একটা ঘণ্টা অপেক্ষা করে আছে!

হাবিবুর চাচা হঠাৎ রাহির দিকে তাকিয়ে বললেন,
-'তোমরা কি আবার সেখানে শিশুদের নিয়ে বসবে?'

রাহি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
-'আমরা চেষ্টা করব।'
-'চেষ্টা নয়,' বৃদ্ধ মানুষটি মৃদু হেসে বললেন,'স্বপ্ন দেখো। কাজ শুরু করলে স্বপ্নেরও পথ তৈরি হয়।'

বাড়ি ফেরার পথে তিন বন্ধু খুব কম কথা বলল।
বটবনের কাছে পৌঁছে অরণ বলল,
-'আমরা কি আজ ঘণ্টাটা বাজাতে পারি?'

নাসির স্যার বললেন,
-'আজ নয়। আগে জায়গাটা নিরাপদ করতে হবে। বড়দের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।'

শিসু একটু হতাশ হলো।
রাহি তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
-'অপেক্ষা করো। ঘণ্টার শব্দ তখনই সুন্দর হবে,যখন তার সঙ্গে শিশুদের হাসিও থাকবে।'

পরের কয়েক দিন শুরু হলো ছোট্ট একটি কাজ।
গ্রামের বড়রা এলেন।
পুরোনো জায়গাটা দেখে কেউ অবাক হলেন,কেউ স্মৃতি বললেন।
কেউ শুকনো ডাল সরালেন।
কেউ বসার জায়গা পরিষ্কার করলেন।
কেউ বললেন,পুরোনো গাছের কোনো ক্ষতি করা যাবে না।
রাহি, অরণ আর শিসু শুধু কাজ দেখল না-নিজেরাও অংশ নিল।

কয়েক দিন পর বটগাছের নিচে একটি ছোট কাঠের ফলক বসানো হলো।
'বটবনের পাঠশালা
প্রকৃতির কাছে শেখার জায়গা'

তার নিচে ছোট করে লেখা-
'পুরোনো স্বপ্ন, নতুন শিশুদের জন্য।'

অবশেষে এল সেই দিন।
বটগাছের নিচে কয়েকজন শিশু বসেছে।
কেউ বই পড়ছে।
কেউ পাখি দেখছে।
কেউ গাছের পাতা নিয়ে ছবি আঁকছে।

নাসির স্যার বললেন,
-'আজকের প্রথম পাঠ-প্রকৃতিকে কীভাবে ভালোবাসতে হয়।'

রাহি ঘণ্টাটির দিকে তাকাল।
অরণ বলল,
-'বাজাবে?'

রাহি শিসুর হাতে ঘণ্টাটি তুলে দিল।
-'আজ তুমি বাজাও।'

শিসু অবাক।
-'আমি?'
-'হ্যাঁ। কারণ তুমিই তো প্রথম বলেছিলে,ঘণ্টাটা আবার বাজবে কি না।'

শিসু দুই হাতে ঘণ্টাটি ধরল।
তারপর-
টং...
একটি স্বচ্ছ শব্দ বটবনের চারপাশে ছড়িয়ে গেল।

পাখিরা ডেকে উঠল।
শিশুরা হাততালি দিল।
হাবিবুর চাচা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তার চোখে পানি চিকচিক করছিল।

রাহি কিছু বলল না।
অরণও না।
শুধু বটদাদুর পাতাগুলো যেন একসঙ্গে কেঁপে উঠল।
মনে হলো, বহু বছর পর বটবনের বুক থেকে একটি পুরোনো স্মৃতি আবার জেগে উঠেছে।

সেদিন সন্ধ্যায় রাহি ডায়েরিতে লিখল,
-'আজ আমরা শুধু একটি ঘণ্টা বাজাইনি। আমরা একটি পুরোনো স্বপ্নকে আবার ডাক দিয়েছি।'

তারপর একটু ভেবে শেষ লাইনটি লিখল-
'কোনো ভালো কাজ সত্যিই হারিয়ে যায় না। কেউ না কেউ একদিন তার পথ খুঁজে নেয়।'

বটদাদুর কণ্ঠ সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে এল,
-'এবার তোমাদের সামনে নতুন পথ।'

রাহি তাকাল।
-'কোথায়?'

বটদাদু উত্তর দিলেন না।
শুধু দূরের বাঁশবনের দিকে কয়েকটি পাখি উড়ে গেল।
তিন বন্ধুর চোখও সেদিকেই চলে গেল।
নতুন কৌতূহল।
নতুন পথ।
নতুন গল্প।

আজকের সবুজ শিক্ষাঃ
প্রকৃতি রক্ষা শুধু গাছ লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতিকে ঘিরে মানুষের স্মৃতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ভালোবাসাকেও বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন।

আজকের ছোট্ট তথ্যঃ
পুরোনো বড় গাছ অনেক সময় একটি এলাকার মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। তাই কোনো পুরোনো গাছ সংরক্ষণ মানে শুধু একটি গাছ বাঁচানো নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিও রক্ষা করা।

এরপর নতুন অধ্যায়
'বাঁশবনের ওপারে'
বটবনের পাঠশালা ফিরে এসেছে। কিন্তু প্রথম দিনের ক্লাস শেষ হওয়ার আগেই একটি শিশু দৌড়ে এসে রাহিদের হাতে একটি অদ্ভুত বাঁশের বাঁশি তুলে দেবে।

বাঁশিটির গায়ে খোদাই করা থাকবে মাত্র তিনটি শব্দ-
'ওপারের পথ দেখো।'
সেখান থেকেই শুরু হবে সম্পূর্ণ নতুন এক রহস্যময় অধ্যায়।


এ জাতীয় আরো খবর