বুধবার, আগস্ট ২৬, ২০২৬

যেদিন মরুর বুকে মানুষ জেগেছিল

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-২৬ ১১:০০:১৭

মরু তখন শুধু বালুর দেশ নয়,
ছিল মানুষের হৃদয়েও মরুভূমি-
তলোয়ারের ঝনঝন শব্দে
কেঁপে উঠত গোত্রের অহংকার,
রক্তের ঋণ বয়ে যেত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে,
দুর্বলের চোখের জল
শক্তের দরবারে ছিল অদৃশ্য।

কন্যাশিশুর হাসি থামিয়ে
কেউ কেউ মাটির বুকে পুঁতে দিত ভবিষ্যৎ,
দাসের কণ্ঠে ছিল না স্বাধীনতার অধিকার,
অসহায়ের ঘরে ছিল না নিরাপত্তা,
বণিকের দাঁড়িপাল্লায় কখনো কমে যেত ন্যায্যতা,
সুদের বোঝায় নুয়ে পড়ত দরিদ্রের জীবন-
সেই সময়কে ইতিহাস বলেছে
জাহেলিয়াতের যুগ।

কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনায়
অন্ধকারেরও এক প্রভাত থাকে।

মক্কার এক ঘরে
এলো এক শিশু-
পিতা তখন পৃথিবীতে নেই,
শৈশবেই হারালেন মাকেও;
তবু এতিম সেই শিশুর হৃদয়ে
জমেনি অভিযোগের অন্ধকার,
বরং গড়ে উঠল এমন এক চরিত্র
যাকে শত্রুও বলত-
বিশ্বস্ত, সত্যবাদী।

তিনি ছিলেন মুহাম্মদ 
আবদুল্লাহর পুত্র,
আমিনার সন্তান,
কুরাইশের মানুষ;
কিন্তু ইতিহাসের কাছে
তিনি হয়ে উঠলেন
সমস্ত মানুষের জন্য রহমতের বার্তাবাহক।

হেরা গুহার নিস্তব্ধ রাতে
যখন প্রথম ওহির আহ্বান এলো,
মরুর বাতাস কি জানত-
আজ বদলে যাবে ইতিহাস?

‘পড়ো’-
এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে
জেগে উঠল জ্ঞান,
জেগে উঠল বিবেক,
জেগে উঠল মানুষের ভেতরের মানুষ।

তিনি বললেন-
এক আল্লাহর কাছে মাথা নত করো,
কিন্তু মানুষের কাছে অন্যায় করো না।
ইবাদত করো,
কিন্তু প্রতিবেশীর ক্ষুধা ভুলে নয়।
সত্য বলো,
আমানত রক্ষা করো,
মাপে কম দিও না,
অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।

তিনি শেখালেন-
মানুষের মর্যাদা
তার বংশের নামের চেয়ে বড়,
তার সম্পদের চেয়ে বড়,
তার গায়ের রঙের চেয়েও বড়।

বিলালের কণ্ঠে যখন
তাওহিদের ধ্বনি উঠল,
তখন মরুর আকাশ যেন জানল-
দাস বলে কেউ জন্মায় না
মানুষের মর্যাদায়।

কিন্তু সত্যের পথ
কখনো কাঁটাহীন ছিল না।

মক্কার পথে
পাথর ছোড়া হলো,
অপমান করা হলো,
নির্যাতন করা হলো,
সঙ্গীদের ওপর নেমে এলো
অসহনীয় অত্যাচার।

তবু তাঁর কণ্ঠে
প্রতিহিংসার আগুন নয়,
ছিল হেদায়াতের প্রার্থনা।

তাই তো তিনি
শত্রুর ঘরেও
মানুষটিকে দেখতেন,
অপরাধের আড়ালেও
ফিরে আসার একটি দরজা রাখতেন।

তারপর এলো হিজরত-
মক্কা থেকে মদিনার পথে
শুধু একজন মানুষের যাত্রা নয়,
ছিল একটি আদর্শের যাত্রা।

মদিনায় তিনি
শুধু একটি নগর গড়েননি,
গড়েছিলেন দায়িত্বের সমাজ;
ভিন্ন সম্প্রদায়, ভিন্ন বিশ্বাস,
ভিন্ন গোত্রের মানুষকে
চুক্তি ও ন্যায়ের বন্ধনে
সহাবস্থানের পথ দেখিয়েছিলেন।

মসজিদের পাশে
ভাই হয়ে দাঁড়ালেন মুহাজির-আনসার,
ক্ষুধার পাশে ভাগ হলো খাদ্য,
অসহায়ের পাশে দাঁড়াল মানুষ-
এভাবেই সমাজ বদলায়,
শুধু বক্তৃতায় নয়,
মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে।

যুদ্ধও এসেছে তাঁর জীবনে,
কিন্তু যুদ্ধ তাঁর আদর্শের লক্ষ্য ছিল না।
বদর, উহুদ, খন্দকের কঠিন দিন
অতিক্রম করেও
তিনি প্রতিশোধকে
জীবনের ধর্ম বানাননি।

আর তারপর-
মক্কা বিজয়ের দিন।

যে নগর তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছিল,
যে মানুষ তাঁকে কষ্ট দিয়েছিল,
যাদের হাতে ছিল
অতীতের অসংখ্য নির্যাতনের স্মৃতি-
সেই নগর তাঁর সামনে নত।

চাইলে সেদিন
তলোয়ারে লেখা যেত প্রতিশোধের ইতিহাস,
কিন্তু মুহাম্মদ (সা.)
লিখলেন ক্ষমার ইতিহাস।

সেই দিন বোঝা গেল-
বিজয় মানে শুধু
শত্রুকে পরাজিত করা নয়;
বিজয় মানে
নিজের প্রতিশোধস্পৃহাকে পরাজিত করা।

তিনি এতিমের চোখে
নিজের শৈশব দেখেছেন,
দরিদ্রের ক্ষুধায়
মানুষের দায়িত্ব দেখেছেন,
নারীর মর্যাদায়
সমাজের সভ্যতা দেখেছেন,
দাসের মুক্তিতে
মানবতার সৌন্দর্য দেখেছেন।

তিনি বলেননি-
শুধু মসজিদে ভালো থেকো;
তিনি শিখিয়েছেন-
বাজারেও ভালো থেকো।

তিনি বলেননি-
শুধু নিজের জন্য ন্যায় চাও;
তিনি শিখিয়েছেন-
যার বিরুদ্ধে অবস্থান,
তার প্রতিও ন্যায় করো।

তিনি বলেননি-
শুধু আপনজনকে ভালোবাসো;
তিনি শিখিয়েছেন-
প্রতিবেশীর অধিকারও
তোমার দায়িত্ব।

বিদায় হজের প্রান্তরে
যখন মানুষের বিশাল সমুদ্র,
তখন তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো
মানবমর্যাদার সেই মহান শিক্ষা-
মানুষের জীবন,সম্পদ ও মর্যাদা
অন্যায়ের শিকার হতে পারে না।

তিনি ভেঙে দিলেন
বংশের অহংকার,
জাতির অহংকার,
সম্পদের অহংকার;
মানুষকে ফিরিয়ে দিলেন
তার প্রকৃত পরিচয়-
সে একজন মানুষ,
আল্লাহর বান্দা।

আজও পৃথিবী বদলেছে,
মরুর তাঁবুর জায়গায়
উঠেছে অট্টালিকা,
উটের কাফেলার জায়গায়
ছুটছে দ্রুতগামী যান,
বার্তার জন্য দিন নয়,
লাগে না মুহূর্তও।

তবু প্রশ্নটি থেকে গেছে-

মানুষ কি সত্যিই বদলেছে?

আজও কোথাও যুদ্ধের আগুন,
কোথাও শিশুর কান্না,
কোথাও ক্ষুধার্ত মুখ,
কোথাও দুর্নীতির অন্ধকার,
কোথাও মিথ্যার বাজার,
কোথাও মানুষের পরিচয়
মানুষের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।

তাই আজ নবীজিকে ভালোবাসা
শুধু মুখে দরুদ পড়ার আবেগ নয়,
ভালোবাসা মানে
তাঁর সত্যকে নিজের জীবনে ধারণ করা।

যে হাতে ক্ষমতা,
সে হাত যেন জুলুম না করে।

যে হাতে সম্পদ,
সে হাত যেন অভাবীর অধিকার ভুলে না যায়।

যে মুখে তাঁর উম্মতের দাবি,
সে মুখ যেন মিথ্যা না বলে।

যে ঘরে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়,
সেই ঘরে যেন
নারী, শিশু ও দুর্বল মানুষ
নিরাপদ থাকে।

যে সমাজ তাঁকে ভালোবাসে,
সে সমাজে যেন
অন্যায় দেখে নীরব থাকা
স্বাভাবিক না হয়ে যায়।

হে আল্লাহর রাসুল,
আপনার আগমন
কেবল সপ্তম শতকের একটি ঘটনা নয়;
আপনার আদর্শের সামনে
আজও দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবী।

আপনি এসেছিলেন
অজ্ঞতার বুক চিরে জ্ঞানের আহ্বান নিয়ে,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের ঘোষণা নিয়ে,
গোত্রের দেয়াল ভেঙে ভ্রাতৃত্ব নিয়ে,
ঘৃণার উত্তাপ পেরিয়ে
ক্ষমার শীতলতা নিয়ে।

আপনার জীবন তাই
শুধু ইতিহাসের পৃষ্ঠা নয়-
একটি চলমান প্রশ্ন:

আমি কি সত্যবাদী?
আমি কি আমানতদার?
আমি কি দুর্বলের পাশে দাঁড়াই?
আমি কি অন্যের অধিকার ফিরিয়ে দিই?
আমি কি ক্ষমা করতে পারি?
আমি কি অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করি?

যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়,
তবে আজও জেগে আছে
সেই আলোর কিছু অংশ।

আর যদি উত্তর ‘না’ হয়,
তবে মিলাদ শুধু উৎসব নয়-
এটি ফিরে আসার ডাক।

মরুর সেই মানুষটি
আজও আমাদের শেখান-

আলো জ্বালাতে
সূর্য হতে হয় না;
একটি সত্য কথাও
অন্ধকার ভেদ করতে পারে।

একটি ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত
একটি জীবন বদলে দিতে পারে।

একটি ক্ষমা
একটি শত্রুকে আপন করতে পারে।

একটি ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো
একটি সমাজকে মানবিক করতে পারে।

তাই হে প্রিয় নবী,
আপনার স্মরণে আজ
শুধু চোখ ভিজুক-এমন নয়;
আমাদের চরিত্র বদলাক।

শুধু ঠোঁটে আপনার নাম নয়,
আমাদের কাজে ফুটে উঠুক
আপনার শিক্ষা।

শুধু ঘরে নয়,
বাজারে, পথে, আদালতে, কর্মক্ষেত্রে,
পরিবারে, সমাজে-
সত্য ও ন্যায়ের আলো ছড়িয়ে পড়ুক।

কারণ আপনি এসেছিলেন
মানুষকে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে।

আপনি এসেছিলেন
অন্ধকারের বিরুদ্ধে
একটি স্থায়ী আলোর বার্তা নিয়ে।

আর সেই আলো
আজও নিভে যায়নি-

যতদিন কোনো মানুষ
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে,
যতদিন কোনো ধনী
অসহায়ের পাশে দাঁড়াবে,
যতদিন কোনো শক্তিমান
দুর্বলের অধিকার রক্ষা করবে,
যতদিন কোনো হৃদয়
ক্ষমাকে প্রতিশোধের ওপরে রাখবে,
ততদিন পৃথিবীর বুকে
আপনার আদর্শের আলো
জ্বলতেই থাকবে।

হে প্রিয় রাসুল (সা.),
আপনার আগমন ছিল
অন্ধকারে একটি প্রভাত-
আর আপনার সুন্নাহ
সেই প্রভাতের পথচিহ্ন।

আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর দিনে
আমাদের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা-

আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম
ওয়া বারিক ‘আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদ।

হে আল্লাহ,
আমাদের ভালোবাসাকে
শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ রেখো না;
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর
সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা,
মানবিকতা ও শান্তির আদর্শ
আমাদের জীবনেও বাস্তব করে দাও।

আমিন।


এ জাতীয় আরো খবর