বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০২৬

বটবনের পুরোনো পাঠশালা'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-২০ ১০:৪৫:০১
প্রতীকী ছবি

বন্ধুরা,গত পর্বে যে হারানো পথের সন্ধান পেল রাহি, অরণ ও শিসু, আজ তারা সেই পথ ধরে পৌঁছাবে বহুদিনের বিস্মৃত একটি জায়গায়। গল্প এবার শুধু রহস্য নয়,তাদের নিজেদের উদ্যোগ ও বন্ধুত্বকেও সামনে নিয়ে যাবে।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'হারানো পথের সন্ধানে'
পর্ব-৫৯: '

সকালের আকাশ পরিষ্কার।
গত দিনের বৃষ্টির পর বটবনের চারপাশ যেন ধুয়ে-মুছে আরও সবুজ হয়ে উঠেছে।
রাহি, অরণ আর শিসু আজ হাতে ঝুড়ি, ছোট কোদাল আর দড়ি নিয়ে বটবনের সেই পুরোনো পথের সামনে দাঁড়িয়ে।

শিসু অবাক হয়ে বলল,
-'আমরা কি সত্যিই আজ পাঠশালাটা খুঁজে পাব?'

অরণ হাসল।
-'গতকাল যে ফলকটা পেয়েছি,তার মানে নিশ্চয়ই কিছু আছে।'

রাহি বলল,
-'তবে মনে রেখো,আমরা কিছু ভাঙব না বা জোর করে কিছু সরাব না। যা আছে, সাবধানে খুঁজব।'

তিনজন ধীরে ধীরে পথ পরিষ্কার করতে শুরু করল।
কিছু শুকনো ডাল সরানো হলো।
কাঁটা ঝোপ পাশ কাটিয়ে দেওয়া হলো।
কিছু জায়গায় শুধু হাত দিয়েই শুকনো পাতা সরানো হলো।

হঠাৎ অরণ চিৎকার করে উঠল,
-'পেয়েছি!'

দুজন দৌড়ে গেল।
ঝোপের নিচে মাটিতে পোঁতা একটি পুরোনো ইট।
ইটের ওপর অস্পষ্ট কিছু অক্ষর।
রাহি মাটি ঝেড়ে পড়ার চেষ্টা করল।

-'এখানে লেখা আছে... পাঠ...'

শিসু উত্তেজনায় বলল,
-'পাঠশালা!'

তারা আরও একটু খুঁজতেই পাশাপাশি কয়েকটি ইট বেরিয়ে এল।
তারপর একটি ভাঙা পাথরের চৌকি।
আর তার পাশে বিশাল একটি বটগাছের শিকড়।

নাসির স্যারও ততক্ষণে সেখানে এসে পৌঁছেছেন।
তিনি জায়গাটা দেখে বললেন,
-'এটাই সম্ভবত সেই পুরোনো পাঠশালার জায়গা।'

শিসু অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল।
-'এখানে সত্যিই বাচ্চারা পড়ত?'

স্যার বললেন,
-'হয়তো। গ্রামের পুরোনো মানুষদের কাছ থেকে আরও তথ্য নিতে হবে।'

রাহি ভাঙা চৌকিটির ওপর হাত রাখল।
তার মনে হলো,বহু বছর আগে কোনো শিশু হয়তো এখানেই বসে বই পড়েছিল।
কেউ হয়তো এই বটগাছের দিকে তাকিয়ে কবিতা মুখস্থ করেছিল।
কেউ হয়তো বৃষ্টির দিনে এখানেই আশ্রয় নিয়েছিল।

অরণ হঠাৎ মাটির পাশে একটা ধাতব বাক্স দেখতে পেল।
বাক্সটি মরচে ধরা।
সে হাত বাড়াতেই রাহি বলল,
-'থামো! আগে স্যারকে দেখাও।'

নাসির স্যার সাবধানে বাক্সটি তুলে নিলেন।
ঢাকনাটি পুরোপুরি বন্ধ নয়।
ভেতরে পাওয়া গেল কয়েকটি পুরোনো চক,একটি ভাঙা কাঠের কলম আর ছোট্ট একটি পিতলের ঘণ্টা।

শিসু বিস্ময়ে বলল,
-'এটাই কি পাঠশালার ঘণ্টা?'

স্যার বললেন,
-'হতে পারে। নিশ্চিত হতে গ্রামের প্রবীণ মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।'

রাহি ঘণ্টাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
-'এত বছর পরও এটা এখানে রয়ে গেছে!'

ঠিক তখন অরণ বাক্সের নিচে একটি ভাঁজ করা কাগজ দেখতে পেল।
কাগজটি প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে।
স্যার খুব সাবধানে খুললেন।
কিছু লেখা এখনও বোঝা যায়।

রাহি ধীরে ধীরে পড়ল,
-'গাছ বাঁচলে ছায়া থাকবে,ছায়া থাকলে শিশুরা খেলবে,আর শিশুরা খেললে এই জায়গা বেঁচে থাকবে।'

তিনজনই চুপ হয়ে গেল।
বটদাদুর পাতাগুলো নড়ছিল।
মনে হলো,বহু বছরের পুরোনো কথাগুলো আবার বাতাসে ফিরে এসেছে।

শিসু বলল,
-'তাহলে পাঠশালার মানুষগুলো গাছের কথাও ভাবত!'

নাসির স্যার বললেন,
-'শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না। মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক বোঝাও শিক্ষার অংশ।'

রাহি চারদিকে তাকিয়ে বলল,
-'আমরা কি জায়গাটা আবার সুন্দর করতে পারি?'

অরণ বলল,
-'পুরোনো পাঠশালা তো আর আগের মতো বানানো সম্ভব নয়।'

রাহি হেসে বলল,
-'আগের মতো কেন? আমরা নতুনভাবে ফিরিয়ে আনব।'

শিসুর চোখ চকচক করে উঠল।
-'কীভাবে?'

রাহি বলল,
-'বটগাছের নিচে মাসে একদিন আমরা শিশুদের নিয়ে বসব। বই পড়ব,গাছের গল্প বলব,পাখি দেখব, প্রকৃতি সম্পর্কে শিখব।'

নাসির স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
-'ভাবনাটা ভালো। তবে গ্রামের বড়দের সঙ্গে আলোচনা করে,নিরাপদভাবে করতে হবে।'

অরণ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-'তাহলে পুরোনো পাঠশালার জায়গা নতুন পাঠশালার জায়গা হবে!'

বটদাদুর ডাল থেকে একটি শুকনো পাতা ধীরে ধীরে নেমে এল।
রাহি পাতাটি হাতে তুলে নিয়ে বলল,
-'পুরোনো গল্প শেষ হয়নি। শুধু নতুন মানুষের অপেক্ষায় ছিল।'

সেদিন তারা কোনো পুরোনো স্থাপনা ভাঙল না।
কোনো গাছ কাটল না।
শুধু জায়গাটা পরিষ্কার করে একটি ছোট কাঠের ফলক বানানোর সিদ্ধান্ত নিল।

ফলকে লেখা হবে-
'বটবনের পাঠশালা
প্রকৃতির কাছে শেখার জায়গা'

বাড়ি ফেরার সময় শিসু পেছনে তাকিয়ে বলল,
-'আজ মনে হচ্ছে, আমরা একটা হারানো জায়গা খুঁজে পাইনি। আমরা একটা হারানো স্বপ্ন খুঁজে পেয়েছি।'

রাহি মুচকি হেসে বলল,
-'আর এবার সেই স্বপ্নটা আমাদের।'

আজকের সবুজ শিক্ষাঃ
পুরোনো গাছ, খোলা জায়গা ও গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ শুধু বর্তমানের জন্য নয়; এগুলোর সঙ্গে মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ইতিহাসও জড়িয়ে থাকতে পারে। তাই উন্নয়নের পাশাপাশি ঐতিহ্য ও প্রকৃতির যত্ন নেওয়াও জরুরি।

আজকের ছোট্ট তথ্যঃ
বাংলার গ্রামাঞ্চলে একসময় অনেক জায়গায় গাছের ছায়ায় অনানুষ্ঠানিকভাবে শিশুদের পড়াশোনা ও নানা সামাজিক কার্যক্রম হতো। বড় গাছ তাই শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, অনেক মানুষের স্মৃতিরও অংশ হয়ে উঠতে পারে।

পুরোনো পিতলের ঘণ্টাটি কি সত্যিই সেই পাঠশালার?
রাহিরা গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ মানুষটির কাছে যাবে উত্তর খুঁজতে। আর সেই সাক্ষাৎ তাদের সামনে তুলে ধরবে এমন এক গল্প,যা বহু বছর ধরে কেউ বলেনি।


এ জাতীয় আরো খবর