রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'মাটির নিচের গোপন শহর'
পর্ব-৫৮:
সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা ছিল অদ্ভুত।
রোদ আছে, কিন্তু তার আলো মলিন।
দূরে কালো মেঘ জমছে।
রাহি, অরণ আর শিসু স্কুল ছুটির পর বটদাদুর কাছে বসে গল্প করছিল।
হঠাৎ শিসু বলল,
-'ওইদিকে কে যেন ডাকছে!'
তিনজনই কান খাড়া করল।
কোথাও কোনো মানুষের শব্দ নেই।
আবার শোনা গেল-
'কুঁ... কুঁ...'
এবার অরণ উঠে দাঁড়াল।
-'এটা তো কোনো পাখির ডাক!'
ডাকটা আসছে বটবনের ভেতর থেকে।
রাহি বলল,
-'চলো, দেখি।'
বটদাদু সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
-'যাবে,তবে একা একা নয়। পথের বাইরে যাবে না।'
তিন বন্ধু সাবধানে এগিয়ে গেল।
কিছুদূর যেতেই তারা দেখল,একটি ছোট্ট শালিক ঝোপের পাশে অস্থিরভাবে লাফাচ্ছে।
তার একটি ডানা যেন ঠিকমতো নড়ছে না।
শিসু দৌড়ে যেতে চাইলে রাহি তাকে থামিয়ে দিল।
'আস্তে। ভয় পেলে আরও দূরে চলে যাবে।'
তারা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শালিকটি এবার একটু শান্ত হলো।
অরণ চারদিকে তাকিয়ে বলল,
-'এখানে তো আগে একটা সরু পথ ছিল!'
রাহি তাকিয়ে দেখল, সত্যিই।
বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া পুরোনো পথটি শুকনো পাতা আর ঝোপে প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে।
ঠিক তখনই বাতাস জোরে বইতে শুরু করল।
আকাশ অন্ধকার হয়ে এল।
শিসু বলল,
-'বৃষ্টি আসছে!'
রাহি দ্রুত বলল,
-'আগে শালিকটাকে নিরাপদ জায়গায় নিতে হবে।'
কিন্তু কীভাবে?
তারা পাখিটিকে ধরতে পারবে না।
অরণ চারদিকে তাকিয়ে একটি নিচু, নিরাপদ ডাল দেখতে পেল।
সে বলল,
-'ওকে ওই ডালের দিকে যেতে সাহায্য করা যায়।'
তারা কোনো শব্দ না করে ধীরে ধীরে ঝোপের এক পাশ থেকে সরে দাঁড়াল।
শালিকটি প্রথমে নড়ল না।
তারপর হঠাৎ ডানা ঝাপটাল।
একবার।
দুবার।
তারপর লাফ দিয়ে ডালটিতে উঠে বসল।
তিন বন্ধুর মুখে হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল।
তারা দৌড়ে বটদাদুর বিশাল শিকড়ের আড়ালে আশ্রয় নিল।
শিসু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-'আজ কিন্তু আমরা একটা নতুন পথ খুঁজে পেলাম!'
অরণ মাথা নাড়ল।
'পথটা হারিয়ে গিয়েছিল,কিন্তু শালিকের জন্য আমরা আবার সেটাকে খুঁজে পেলাম।'
রাহি চারদিকে তাকাল।
বৃষ্টির পানিতে পাতাগুলো ধুয়ে ঝকঝক করছে।
হঠাৎ তার চোখে পড়ল-
পুরোনো পথের পাশে মাটির ওপর একটি কাঠের ছোট্ট ফলক।
শেওলায় ঢাকা।
সে হাত দিয়ে আলতো করে শেওলা সরাতেই কিছু লেখা দেখা গেল।
'বটবনের পাঠশালা'
তিনজন একসঙ্গে চমকে উঠল।
'পাঠশালা?'
অরণ বলল,
-'এখানে আবার পাঠশালা কোথা থেকে এলো?'
বটদাদু কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
-'অনেক বছর আগে এই বটবনের পাশে গ্রামের শিশুদের জন্য একটি খোলা পাঠশালা বসত। গাছের ছায়ায় তারা পড়ত,খেলত,গান শিখত।'
রাহির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
-'তারপর?'
-'সময় বদলেছে। পাঠশালা বন্ধ হয়ে গেছে। পথটিও ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে।'
শিসু অবাক হয়ে বলল,
-'তাহলে আজ আমরা শুধু একটা পাখির পথ খুঁজতে এসে একটা পুরোনো গল্প খুঁজে পেলাম!'
বটদাদু বললেন,
-'প্রকৃতির পথের পাশে মানুষের স্মৃতিও কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে।'
বৃষ্টি একটু কমতেই তিন বন্ধু আবার ফলকটির কাছে গেল।
ফলকের নিচে আরও একটি ছোট বাক্য লেখা ছিল-
-'যে পথ শিশুর হাসি শুনেছে,তাকে হারিয়ে যেতে দিও না।'
রাহি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
অরণ বলল,
-'আমরা কি পথটা পরিষ্কার করতে পারি?'
রাহি হাসল।
-'অবশ্যই। তবে বড়দের সঙ্গে নিয়ে।'
শিসু বলল,
-'আর সেই পুরোনো পাঠশালাটা খুঁজে বের করব!'
তিনজনের চোখে তখন নতুন উত্তেজনা।
আজ তারা শুধু একটি পাখিকে নিরাপদে পৌঁছে দেয়নি।
তারা খুঁজে পেয়েছে একটি হারানো পথ।
আর সেই পথের শেষে হয়তো অপেক্ষা করছে বহু বছরের পুরোনো কোনো গল্প।
রাহি ডায়েরি খুলে লিখল,
'কখনো কখনো আমরা যে পথ খুঁজি,পথটি আমাদের এমন জায়গায় নিয়ে যায়,যার কথা আমরা জানতামই না।'
বটদাদুর পাতাগুলো বৃষ্টির ফোঁটায় ঝিকমিক করছিল।
মনে হলো, বটদাদুও যেন হাসছেন।
আজকের সবুজ শিক্ষাঃ
প্রকৃতির পথ,গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা করা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়; এসব জায়গা বহু প্রাণীর বেঁচে থাকার সঙ্গে জড়িত।
আজকের ছোট্ট তথ্যঃ
শালিক মানুষের বসতির আশপাশে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে এবং নানা ধরনের খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে। গাছপালা ও ঝোপঝাড় তাদের আশ্রয় ও খাদ্য খোঁজার গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
আমাদের পরের পর্ব-
'বটবনের পুরোনো পাঠশালা'
সেখানে রাহিরা খুঁজে বের করবে হারিয়ে যাওয়া পাঠশালার চিহ্ন। তবে শুধু পুরোনো স্মৃতি নয়-সেখানে তারা এমন একটি জিনিস আবিষ্কার করবে, যা গ্রামের বর্তমান পরিবেশ রক্ষার কাজে নতুনভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।